রাশিয়ান ক্রুড অয়েলের উপর আরোপিত আমেরিকান স্যাংশন ওয়েভারের মেয়াদ শেষ হয়েছে। ১৬ মে রাত ১২:০১ এ ইএসটিতে এই অস্থায়ী ছাড়ের সময়সীমা শেষ হওয়ায় বিশ্ববাজারে নতুন করে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। শুধু ভারত নয়, চীন, তুরস্ক, বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তানসহ গ্লোবাল সাউথের অনেক দেশ এখন জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি। ইরানের সঙ্গে হরমুজ প্রণালীর কার্যত বন্ধ অবস্থা মিলিয়ে বিশ্ব তেল সরবরাহে বড় ধাক্কা লাগতে চলেছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তকে অনেকে রিস্ক-অফ ইভেন্ট হিসেবে দেখছেন। বন্ড মার্কেট ইতিমধ্যে অস্থিরতা দেখাচ্ছে। তেলের দাম বাড়ছে, ব্রেন্ট ক্রুড ১০০ ডলারের উপরে চড়েছে এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির নতুন চাপ তৈরি হচ্ছে। যুদ্ধের কারণে ইরানের তেলও বাজার থেকে অনেকাংশে সরে গেছে। ফলে রাশিয়ান তেলের উপর নির্ভরশীল দেশগুলোর জন্য বিকল্প সোর্স খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে উঠবে।
ভারতের কথাই ধরা যাক। রেকর্ড পরিমাণে রুশ তেল আমদানি করে দেশের রিফাইনারিগুলো এতদিন সাশ্রয়ী জ্বালানি নিশ্চিত করেছিল। এখন সেই সুবিধা বন্ধ হলে পেট্রোল-ডিজেলের দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। শিল্প উৎপাদন, পরিবহন, কৃষি — সবক্ষেত্রেই খরচ বেড়ে অর্থনৈতিক চাপ বাড়বে। চীন, যা রুশ তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা, তারও স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভ ও শ্যাডো ফ্লিটের উপর চাপ বাড়বে। তুরস্ক এনার্জি হাব হিসেবে যে ভূমিকা পালন করছিল, তাতেও প্রভাব পড়বে। বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তানের মতো দেশগুলোর জন্য তো পরিস্থিতি আরও কঠিন — সেখানে জ্বালানি সংকট সরাসরি জনজীবনকে প্রভাবিত করবে।
ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি ছিল রাশিয়া ও ইরানকে চাপে রাখা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এই চাপ গ্লোবাল সাউথের উপরই বেশি পড়ছে। চীনের সঙ্গে আলোচনা ইরান ইস্যুতে কোনো অফ-র্যাম্প দিতে পারেনি। ফলে হরমুজ বন্ধ থাকা অবস্থায় রুশ তেলের সরবরাহও কমলে বিশ্বব্যাপী তেলের দাম আরও ঊর্ধ্বমুখী হবে। বন্ড মার্কেটের প্রথম সংকেত ইতিমধ্যে দেখা যাচ্ছে — ইকুইটি মার্কেট অস্থির, ইনফ্লেশনের ভয় বাড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে — কতদিন এই পথে চলা সম্ভব? বাজারের চাপ, মিত্রদের অসন্তোষ এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষোভ শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে কি? মাল্টিপোলার বিশ্বে একতরফা স্যাংশনের কার্যকারিতা নিয়েই এখন বিতর্ক চলছে।
রাশিয়ান তেলের ওয়েভার শেষ হওয়া শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়। এটি বিশ্ব জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের এক বড় পরীক্ষা। গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোকে এখন বিকল্প উৎস খুঁজতে হবে, দাম মেনে নিতে হবে এবং নতুন কূটনৈতিক পথ খুঁজতে হবে। বিশ্ববাজার যতক্ষণ না নতুন ভারসাম্য খুঁজে পায়, ততক্ষণ এই অস্থিরতা চলবে।
এই সংকট থেকে শিক্ষা নিয়ে জ্বালানি বৈচিত্র্যকরণ এবং নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে দ্রুত এগোনোই এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, তেলের দামের ঊর্ধ্বগতি শুধু অর্থনীতিকেই নয়, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকেও বড় ধাক্কা দিতে পারে।

