প্রণালীতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা যখন বিশ্বকে নতুন গ্রেট গেমের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে ভারত-রাশিয়া প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ঘটেছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ভারতীয় বিমানবাহিনীকে অত্যাধুনিক আর-৩৭এম (R-37M) ‘অ্যাক্সহেড’ আলট্রা লং-রেঞ্জ বিওয়াইআর (BVR) ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের অনুমতি দিয়েছেন। রুশ সামরিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুসারে, পুতিনের সরাসরি অনুমোদনের পর রাশিয়ার প্রতিরক্ষা শিল্প ভারতকে এই বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী এয়ার-টু-এয়ার মিসাইল সরবরাহের প্রস্তাব দিতে প্রস্তুত।
এই ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ৩০০ থেকে ৪০০ কিলোমিটার। এটি হাইপারসনিক গতিতে উড়তে সক্ষম, ইলেকট্রনিক জ্যামিং প্রতিরোধী এবং একাধিক লক্ষ্যবস্তু আক্রমণ করতে পারে। বিশেষ করে শত্রুপক্ষের এয়ারওয়ার্নিং অ্যান্ড কন্ট্রোল এয়ারক্রাফট ও কৌশলগত বোমারু বিমান ধ্বংসে এটি অত্যন্ত কার্যকর। ভারতীয় সুখোই এসইউ-৩০এমকেআই যুদ্ধবিমানের সঙ্গে এই ক্ষেপণাস্ত্রের সংযোজন ভারতীয় বিমানবাহিনীর দূরপাল্লার আক্রমণ ক্ষমতাকে ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে দেবে।
হরমুজ প্রণালীতে চলমান অবরোধের কারণে আন্তর্জাতিক তেল সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ঠিক এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ান তেলের ওপর ৩০ দিনের স্যাংশন ওয়েভার বাড়িয়েছে, যাতে ভারতসহ বিভিন্ন দেশ রুশ তেল আমদানি অব্যাহত রাখতে পারে। একদিকে আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়ানো, অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি সহযোগিতা জোরদার করা — এটিই ভারতের বহুমুখী কূটনীতির সারকথা।
পুতিনের এই অনুমোদন ভারত-রাশিয়া সম্পর্কের নতুন উচ্চতা নির্দেশ করছে। বর্তমানে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের কার্যকলাপ এবং পশ্চিম এশিয়ার উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ভারত তার বিমানবাহিনীর যুদ্ধক্ষমতা বৃদ্ধিতে জোর দিচ্ছে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আর-৩৭এম ক্ষেপণাস্ত্র পেলে ভারতীয় বিমানবাহিনী চীন ও পাকিস্তানের আধুনিক যুদ্ধবিমানের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য সুবিধা পাবে।
একই সময়ে ভারতের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও ইতিবাচক খবর এসেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের মোট রপ্তানি (পণ্য ও সেবা) রেকর্ড $৮৬০ বিলিয়নে পৌঁছেছে। পণ্য রপ্তানি $৪৪১ বিলিয়ন এবং সেবা রপ্তানি $৪০০ বিলিয়ন ছাড়িয়েছে। ইলেকট্রনিক্স খাতে চীনের ওপর নির্ভরতা কমছে। চীনেই ইলেকট্রনিক কম্পোনেন্ট রপ্তানি $৩.৫ বিলিয়নে উঠেছে। প্রতিরক্ষা রপ্তানি ৬২ শতাংশ বেড়ে $৪.১ বিলিয়ন হয়েছে এবং ৮০টিরও বেশি দেশে ভারতীয় প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম যাচ্ছে।
হরমুজ অবরোধ সত্ত্বেও আরব দেশগুলোতে খাদ্য রপ্তানিতে ভারত ব্রাজিলকে টপকে শীর্ষস্থান দখল করেছে। মার্চ মাসে বাণিজ্য ঘাটতি কমে $২০.৬৭ বিলিয়ন হয়েছে। এই সাফল্য দেখিয়ে দিচ্ছে যে, আন্তর্জাতিক সংকটের মধ্যেও ভারত সুযোগ তৈরি করতে পারে।
একই সপ্তাহে ইসরায়েলের আইসিএল গ্রুপ গুজরাটের দাহেজে বিশেষায়িত সার কারখানা উদ্বোধন করেছে। এই কারখানা উন্নত প্রযুক্তিতে স্পেশালিটি সার উৎপাদন করবে, যা ফসলের উৎপাদনশীলতা বাড়াবে এবং সারের ব্যবহার কমাবে। হরমুজ সংকটে সারের দাম আকাশছোঁয়া হওয়ার মধ্যে এই বিনিয়োগ ভারতের কৃষি খাতকে বড় স্বস্তি দেবে এবং আমদানি নির্ভরতা কমাবে।
প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নেও ভারত সক্রিয়। নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহের আসন্ন সফরে নতুন প্রকল্প, এমওইউ এবং আরোগ্য বাটিকার মতো উদ্যোগ আসছে। স্বাস্থ্য, আয়ুষ এবং বাণিজ্যে সহযোগিতা বাড়বে।
ওয়াশিংটন ভারতকে তার ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে পুরোপুরি বেঁধে ফেলতে চায়। কিন্তু ভারত জাপান বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো নিরাপত্তার বিনিময়ে সার্বভৌমত্ব বিক্রি করবে না। রাশিয়ার সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি সম্পর্ক, ইসরায়েলের সঙ্গে কৃষি প্রযুক্তি সহযোগিতা এবং আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব — এই বহুমুখী নীতি ভারতের স্বাধীনতার প্রমাণ।
ডি-ডলারাইজেশন ধীরে চলছে। ভারত নিজস্ব মুদ্রায় লেনদেন বাড়াচ্ছে। হরমুজ অবরোধে আমেরিকা নিজেকে তেলের সুইং প্রডিউসার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলেও ভারত তার স্বার্থ অনুসারে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এখনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দেয়নি, কিন্তু উচ্চপর্যায়ের আলোচনা শুরু হয়েছে। আর-৩৭এম ক্ষেপণাস্ত্র পেলে ভারতের ‘আত্মনির্ভর ভারত’ অভিযান আরও শক্তিশালী হবে।
হরমুজ সংকট, তেলের দাম বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক চাপ সত্ত্বেও ভারত এগিয়ে চলেছে। রেকর্ড রপ্তানি, প্রতিরক্ষা স্বনির্ভরতা, কৃষিতে বিদেশি বিনিয়োগ এবং বহুমুখী কূটনীতি — এগুলোই ভারতের শক্তি।
ভারত কোনো ব্লকের প্যান নয়। আমরা নিজের ভাগ্য নিজেরাই নির্ধারণ করব। পুতিনের অনুমোদন এবং আইসিএল-এর কারখানা উদ্বোধন দেখিয়ে দিচ্ছে যে, সংকটের মধ্যেও ভারত সুযোগ তৈরি করছে এবং তার কৌশলগত স্বাধীনতা অটুট রাখছে।
এই যাত্রা অব্যাহত থাকলে ভারত শুধু টিকবে না, ২১শ শতাব্দীর এক শক্তিশালী মেরু হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। স্বাধীন, স্বাবলম্বী এবং গর্বিত ভারত — এটিই আমাদের লক্ষ্য।
