ভারতের শিপিং মন্ত্রণালয় চারটি জাহাজকে বিশেষ এককালীন অনুমতি দিয়েছে — যেগুলো ইরান থেকে অপরিশোধিত তেল বহন করে আসছে। এই অনুমতি দেওয়া হয়েছে মূলত রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে। তিনটি শিল্প সূত্র রয়টার্সকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। জাহাজগুলো গুজরাটের পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত সিক্কা বন্দরে ভিড়বে বলে জানা গেছে।
বিষয়টা একটু জটিল। ইরানি তেল বহনকারী এই জাহাজগুলো সাধারণত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিমা বা নিরাপত্তা সনদ ছাড়াই চলাচল করে। এই ধরনের জাহাজবহরকে বলা হয় “শ্যাডো ফ্লিট” বা ছায়া নৌবহর — অর্থাৎ যেসব জাহাজ আন্তর্জাতিক নিয়মকানুনের বাইরে থেকে কাজ করে। ভারতের নিজস্ব নিয়ম অনুযায়ী এই ধরনের জাহাজকে বন্দরে ভেড়ার অনুমতি দিতে হলে সরকারের বিশেষ ছাড় লাগে। সেই ছাড়টাই এবার দেওয়া হয়েছে।
একটি সূত্র জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে যে জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, সেটাকে সামনে রেখেই শিপিং মন্ত্রণালয় এই বিশেষ ছাড় মঞ্জুর করেছে। রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রিফাইনিং কমপ্লেক্সের পরিচালক — এই পরিচয়টা এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ। এত বড় একটি প্রতিষ্ঠান হঠাৎ কাঁচামালের সংকটে পড়লে সেটা শুধু ব্যবসায়িক সমস্যা নয়, দেশের জ্বালানি সরবরাহেও প্রভাব পড়তে পারে।
যে চারটি জাহাজকে অনুমতি দেওয়া হয়েছে সেগুলো হলো — কমোরোস-পতাকাবাহী আফ্রামাক্স জাহাজ কাভিজ, কুরাকাও-পতাকাবাহী ভিএলসিসি লেনোর, এবং ইরানের পতাকাবাহী দুটি ভিএলসিসি — ফেলিসিটি এবং হেডি। দ্বিতীয় একটি সূত্র এই চারটি জাহাজের নাম নিশ্চিত করেছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই চারটি জাহাজই মার্কিন নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রয়েছে এবং সবকটিরই বয়স ২০ বছরের বেশি।
এখানে একটা বিষয় লক্ষ্য করা যায় — ভারতের নিয়ম অনুযায়ী, ২০ বছরের বেশি বয়সী যেকোনো জাহাজকে সমুদ্রযোগ্যতার সনদ দেখাতে হয়। এই সনদটি আসতে হবে আন্তর্জাতিক ক্লাসিফিকেশন সোসাইটি সংস্থার (IACS) কোনো সদস্যের কাছ থেকে, অথবা ভারতের সামুদ্রিক প্রশাসন কর্তৃক অনুমোদিত কোনো সংস্থার কাছ থেকে। কিন্তু এই ক্ষেত্রে সেই শর্তটুকু শিথিল করা হয়েছে।
তবে একটা অনিশ্চয়তাও আছে। তৃতীয় একটি সূত্র জানিয়েছে যে অনুমতি মিললেও রিলায়েন্স এই ইরানি তেল আসলেই প্রক্রিয়া করবে কি না, সেটা এখনো নিশ্চিত নয়। কারণ রিলায়েন্স চায় পুরো লেনদেনটা নিষেধাজ্ঞার নিয়ম মেনে এবং ভারতের আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে হোক। সহজভাবে বললে — অনুমতি পাওয়া মানেই তেল কেনা নিশ্চিত হয়ে যাওয়া নয়।
ভারত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক ও ভোক্তা দেশ। দেশটি সর্বশেষ ২০১৯ সালের মে মাসে ইরান থেকে তেল কিনেছিল। সেবার মার্কিন চাপের মুখে ভারতকে ইরানি অপরিশোধিত তেল কেনা বন্ধ করতে হয়েছিল। প্রায় সাত বছর পর আবার এই বিষয়টা আলোচনায় এসেছে।
পরিস্থিতি বদলেছে কারণ গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র সমুদ্রপথে ইরানি তেল কেনার উপর থেকে সাময়িকভাবে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে — মূলত তেলের বাজারের দাম কিছুটা কমিয়ে আনার উদ্দেশ্যে। তবে এই ছাড়ের মেয়াদ মাত্র ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত। অর্থাৎ হাতে সময় খুবই কম।
এদিকে ভারতের সরকারি তেল কোম্পানি ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন (IOC) ইতোমধ্যে নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত ট্যাঙ্কার জয়া-তে বাহিত ইরানি তেল কিনেছে বলে শিপ ট্র্যাকিং তথ্য থেকে জানা গেছে। এটা বলে দেয় যে শুধু রিলায়েন্স নয়, সরকারি পর্যায়েও ইরানি তেল কেনার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে।
ভারতের তেল মন্ত্রণালয়, শিপিং মন্ত্রণালয় এবং রিলায়েন্স — তিনটি পক্ষকেই এ বিষয়ে রয়টার্স ইমেইল করেছিল। কিন্তু কেউই কোনো জবাব দেয়নি।
সামগ্রিকভাবে দেখলে, এই ঘটনাটা ভারতের জ্বালানি নীতির একটা গুরুত্বপূর্ণ মোড়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। হরমুজ প্রণালীর পরিস্থিতি, তেলের বাজারের অস্থিরতা এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞার সাময়িক শিথিলতা — এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে এমন একটা সুযোগ তৈরি করেছে যা ভারত হয়তো ব্যবহার করতে চাইছে। তবে পুরো বিষয়টা এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যে ঝুলছে। আগামী কয়েক দিনেই বোঝা যাবে রিলায়েন্স শেষ পর্যন্ত এই তেল প্রক্রিয়া করার সিদ্ধান্ত নেয় কি না।
সুত্র – রয়টার্স
