বিশ্ব যখন মধ্যপ্রাচ্যের ইরান-আমেরিকা সংঘাতে উত্তপ্ত, তখন দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত তার প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে একটি স্থিতিশীলতার বার্তা দিচ্ছে। নেপালের নবনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহ ভারত সফরে আসছেন। নেপালের রাষ্ট্রদূত ড. শঙ্কর প্রসাদ শর্মা জানিয়েছেন, এই সফরে নতুন প্রকল্পের উদ্বোধন, এমওইউ স্বাক্ষর এবং ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে। এই সফর শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নয়ন নয়, আঞ্চলিক শান্তি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খনাল আগেই নিশ্চিত করেছেন যে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণ গ্রহণ করে বালেন শাহ ভারতে আসতে সম্মত হয়েছেন। ২০২৩ সালের পর এটিই নেপাল থেকে প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের প্রথম সফর। রাষ্ট্রদূত শর্মা বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী সফরের আগে দুই দেশের মধ্যে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সফর হবে। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, স্বাস্থ্য, আয়ুষ, নিরাপত্তা — এসব খাতে গত দেড় বছরে যে অগ্রগতি হয়েছে, তা এই সফরে ফুটে উঠবে। তিনি উল্লেখ করেছেন, “এতগুলো বিষয় রয়েছে যা থেকে বেছে নেওয়ার সুযোগ আছে।”
স্বাস্থ্য খাতে দুই দেশের মধ্যে একটি এমওইউ ইতিমধ্যে চূড়ান্ত হয়েছে এবং শীঘ্রই স্বাক্ষরিত হতে পারে। আয়ুর্বেদ ও ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসায় ভারতের সঙ্গে নেপালের অংশীদারিত্ব আরও জোরদার হচ্ছে। রাষ্ট্রদূত বলেছেন, “আয়ুর্বেদে অধিকাংশ মানুষ ভারতে পড়াশোনা করেন। দুই দেশের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়, ওষুধ ও চিকিৎসা সহযোগিতা খুবই শক্তিশালী।” এই প্রেক্ষাপটে নেপাল দূতাবাসে আন্তর্জাতিক সুস্থতা দিবস উপলক্ষে ‘আরোগ্য বাটিকা’ নামে একটি ভেষজ উদ্যান উদ্বোধন করা হয়েছে। জাতিসংঘ ঘোষিত এই দিবসের প্রস্তাব নেপালেরই ছিল এবং ভারতসহ অন্যান্য দেশ তা সমর্থন করেছে।
নেপাল হিমালয় অঞ্চলে তার সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য এবং ঔষধি গাছের জন্য বিখ্যাত। ভারতে ২৮ হাজারেরও বেশি ভেষজ উদ্যান রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে এই ঐতিহ্য ও জ্ঞান বিনিময়ের মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতে নতুন সহযোগিতা গড়ে উঠবে। রাষ্ট্রদূত শর্মা বলেছেন, দূতাবাসে বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং সাংস্কৃতিক যোগসূত্র বাড়ানোর জন্য নানা কর্মসূচি চলছে। লক্ষ্য হলো নেপাল-ভারত সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া।
এই সফরের প্রেক্ষাপট বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ কারণ বিশ্বব্যাপী অস্থিরতা বাড়ছে। ইরানে চলমান সংঘাত এবং স্ট্রেইট অব হরমুজে আমেরিকার নৌ-অবরোধের ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও সরবরাহ চেইন বিঘ্নিত হয়েছে। ভারতের মতো দেশগুলো তেল, সার এবং অন্যান্য পণ্যের দাম বৃদ্ধির চাপ অনুভব করছে। এমন সময়ে প্রতিবেশীদের সঙ্গে শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধন গড়ে তোলা ভারতের কৌশলগত প্রয়োজন। নেপালের সঙ্গে জলসম্পদ, বাণিজ্য, পর্যটন এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় নতুন প্রকল্পগুলো দুই দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বাড়াবে।
ভারত-নেপাল সম্পর্কের ইতিহাস সুপ্রাচীন। সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও ভৌগোলিকভাবে দুই দেশ অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। কিন্তু গত কয়েক বছরে কিছু চ্যালেঞ্জও দেখা দিয়েছিল। বালেন শাহের মতো তরুণ ও গতিশীল নেতৃত্বের আগমন এই সম্পর্ককে নতুন গতি দিতে পারে। তিনি মার্চের শেষে দায়িত্ব নিয়েছেন। তার সফরে বিনিয়োগ, স্বাস্থ্য, আয়ুষ এবং নিরাপত্তা খাতে বেশ কয়েকটি বড় ঘোষণা আসতে পারে। নতুন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন দুই দেশের মানুষের মধ্যে আস্থা বাড়াবে।
ইরান সংকটের কারণে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে বিকল্প কৌশল গ্রহণ করতে হচ্ছে। ভারত মধ্যপ্রাচ্যের বিকল্প তেল উৎস খুঁজছে, সার আমদানির জন্য নতুন বাজার তৈরি করছে। একইসঙ্গে প্রতিবেশীদের সঙ্গে অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য ও সহযোগিতা বাড়িয়ে অর্থনৈতিক ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা চলছে। নেপালের সঙ্গে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, সড়ক যোগাযোগ এবং বাণিজ্য সুবিধা বৃদ্ধি এই কৌশলের অংশ।
রাষ্ট্রদূত শর্মা জোর দিয়ে বলেছেন যে, দূতাবাসে মানুষে-মানুষে যোগাযোগ বাড়ানোর কর্মসূচি চলছে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বাণিজ্য মেলা এবং বিনিয়োগ সম্মেলনের মাধ্যমে সম্পর্ক আরও গভীর হচ্ছে। আরোগ্য বাটিকার মতো উদ্যোগ ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানের বিনিময়কে প্রতীকীভাবে তুলে ধরছে। হিমালয়ের ঔষধি গাছের সম্পদকে কাজে লাগিয়ে দুই দেশ যৌথ গবেষণা ও উৎপাদনে এগোতে পারে। এতে স্বাস্থ্য পর্যটনও বাড়বে।
ভারতের জন্য নেপাল শুধু প্রতিবেশী নয়, কৌশলগত অংশীদার। সীমান্ত নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় দুই দেশের সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি। বালেন শাহের সফরে নিরাপত্তা খাতেও নতুন আলোচনা হতে পারে।
বিশ্বব্যাপী যখন যুদ্ধের ছায়া লম্বা হয়ে পড়ছে, তখন দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি ও সহযোগিতার এই উদ্যোগ প্রশংসনীয়। ভারত ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতিকে বাস্তবে রূপ দিচ্ছে। নেপালের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন শুধু অর্থনৈতিক নয়, সাংস্কৃতিক ও মানবিক যোগসূত্রকেও মজবুত করবে।
এই সফর সফল হলে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য বাড়বে, বিনিয়োগ আসবে এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে। ইরান সংকটের কারণে যে অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলায় আঞ্চলিক সহযোগিতা একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। ভারত-নেপালের এই যাত্রা দেখিয়ে দিচ্ছে যে, সংকটের সময়েও কূটনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা দিয়ে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।
বালেন শাহের সফরকে ঘিরে উভয় দেশে উচ্চ প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই প্রত্যাশা পূরণ হলে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক স্থাপত্য আরও মজবুত হবে। ইরান যুদ্ধের দূরবর্তী প্রভাব থেকে নিজেদের রক্ষা করতে এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বাড়াতে এই ধরনের সহযোগিতা অপরিহার্য।
দুই দেশের নেতৃত্বের মধ্যে এই উষ্ণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে আরও বড় সাফল্য অপেক্ষা করছে। আরোগ্য বাটিকার মতো ছোট উদ্যোগ থেকে শুরু করে বড় প্রকল্প পর্যন্ত — সবকিছু দিয়ে দুই দেশ একসঙ্গে এগোবে। এটি শুধু ভারত-নেপালের জয় নয়, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে একটি উজ্জ্বল পদক্ষেপ।
