Monday, April 20, 2026
HomeIndia Defence Technology & Industryভারতের নিউক্লিয়ার স্বপ্ন সত্যি: কলপাক্কমের প্রোটোটাইপ ফাস্ট ব্রিডার রিয়্যাক্টর ক্রিটিক্যাল, দ্বিতীয় স্তরে...

ভারতের নিউক্লিয়ার স্বপ্ন সত্যি: কলপাক্কমের প্রোটোটাইপ ফাস্ট ব্রিডার রিয়্যাক্টর ক্রিটিক্যাল, দ্বিতীয় স্তরে প্রবেশ করে থোরিয়াম যুগের সূচনা।

ভারত আজ ইতিহাস গড়েছে। পশ্চিমা দেশগুলো যাকে “টেকনোলজিক্যালি অসম্ভব” বলে দাবি করেছিল, ৫০ বিলিয়ন ডলার খরচ করে যা ব্যর্থ হয়েছে, সেই ফাস্ট ব্রিডার রিয়্যাক্টর প্রযুক্তিতে ভারত সফল হয়েছে মাত্র ১ বিলিয়ন ডলারেরও কম খরচে। ৭ এপ্রিল ২০২৬, ভারতের কলপাক্কমে অবস্থিত প্রোটোটাইপ ফাস্ট ব্রিডার রিয়্যাক্টর (PFBR) সফলভাবে ক্রিটিক্যালিটি অর্জন করেছে। এর ফলে ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে তার তিন স্তরের নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্রোগ্রামের দ্বিতীয় স্তরে প্রবেশ করল। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই মাইলফলককে “ভারতের সিভিল নিউক্লিয়ার জার্নির এক নতুন অধ্যায়” বলে অভিহিত করেছেন।

এই সাফল্য শুধু শক্তি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি সভ্যতাগত স্বাধীনতার দিক থেকেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ভারত বিশ্বের সবচেয়ে বড় থোরিয়াম রিজার্ভের অধিকারী। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে সেই সম্পদকে কাজে লাগিয়ে দেশ অসীম দেশীয় শক্তির উৎসের দ্বার উন্মোচন করতে চলেছে।

ভারতের তিন স্তরের নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্রোগ্রামের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন দেশের নিউক্লিয়ার বিজ্ঞানের জনক ড. হোমি জাহাঙ্গীর ভাবা। ১৯৫০-এর দশকে, যখন হিরোশিমা-নাগাসাকির পর নিউক্লিয়ার শক্তি নিয়ে বিশ্বব্যাপী আতঙ্ক ছিল, তখন তিনি প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, শক্তি নিরাপত্তা ছাড়া সভ্যতার টিকে থাকা সম্ভব নয়। ভাবা বলেছিলেন, “একটি সভ্যতাকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে তাকে শক্তিকে জয় করতে হবে।”

 

প্রথম স্তর (Stage 1): প্রেশারাইজড হেভি ওয়াটার রিয়্যাক্টর (PHWR) ব্যবহার করে প্রাকৃতিক ইউরেনিয়াম থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং প্লুটোনিয়াম উৎপাদন। বর্তমানে ভারতে প্রায় ৫ গিগাওয়াট নিউক্লিয়ার ক্ষমতা রয়েছে।

 

দ্বিতীয় স্তর (Stage 2): ফাস্ট ব্রিডার রিয়্যাক্টর (FBR) যা প্লুটোনিয়ামকে ফুয়েল হিসেবে ব্যবহার করে আরও বেশি প্লুটোনিয়াম উৎপাদন করে (ব্রিডিং) এবং থোরিয়ামকে ইউরেনিয়াম-২৩৩-এ রূপান্তরিত করে। এটিই এখন সক্রিয় হয়েছে।

 

তৃতীয় স্তর (Stage 3): থোরিয়াম-ভিত্তিক রিয়্যাক্টর যা প্রায় অসীম দেশীয় শক্তি সরবরাহ করবে।

ভারতের অ্যাটমিক এনার্জি কমিশন এবং ভারতীয় নিউক্লিয়ার পাওয়ার কর্পোরেশন লিমিটেডের (NPCIL) অধীনে BHAVINI (Bharatiya Nabhikiya Vidyut Nigam Limited) এই ৫০০ মেগাওয়াট প্রোটোটাইপ ফাস্ট ব্রিডার রিয়্যাক্টর নির্মাণ করেছে। ২০০৪ সালে প্রকল্প শুরু হয়েছিল। প্রাথমিক বাজেট ছিল ৪২০ কোটি টাকা। ২২ বছরের অধ্যবসায়, একাধিক বিলম্ব এবং খরচ বৃদ্ধির পরও প্রকল্পটি সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে সম্পন্ন হয়েছে।

রিয়্যাক্টরটি সোডিয়াম কুল্যান্ট ব্যবহার করে। এটি প্লুটোনিয়াম ফুয়েল দিয়ে চালিত ফাস্ট নিউট্রন ব্রিডার। এর বিশেষত্ব হলো— এটি যতটা ফুয়েল খায়, তার চেয়ে বেশি ফুয়েল (প্লুটোনিয়াম) উৎপাদন করে। এছাড়া থোরিয়াম ব্ল্যাঙ্কেট ব্যবহার করে ইউরেনিয়াম-২৩৩ উৎপাদন শুরু হয়েছে।

বিশ্বে বর্তমানে শুধু রাশিয়ার কাছে বাণিজ্যিক স্কেলের ফাস্ট ব্রিডার রিয়্যাক্টর রয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলো— যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, যুক্তরাজ্য, জার্মানি— প্রত্যেকে এই প্রযুক্তিতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করে ব্যর্থ হয়েছে। জাপানের মনজু রিয়্যাক্টরে সোডিয়াম ফায়ার হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র ১৫ বিলিয়ন ডলার খরচ করে প্রকল্প বন্ধ করেছে। ভারত তাদের সব ব্যর্থতার শিক্ষা নিয়ে, রাশিয়ার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এই সাফল্য পেয়েছে।

প্রাকৃতিক ইউরেনিয়ামে মাত্র ০.৭% ফিসাইল U-235 থাকে। বাকি ৯৯.৩% U-238। প্রথম স্তরে PHWR-এ U-235 থেকে বিদ্যুৎ তৈরি হয় এবং U-238 থেকে প্লুটোনিয়াম-২৩৯ উৎপাদিত হয়। দ্বিতীয় স্তরের FBR-এ সেই প্লুটোনিয়ামকে ফুয়েল হিসেবে ব্যবহার করে আরও প্লুটোনিয়াম ব্রিড করা হয়। একই সঙ্গে থোরিয়াম-২৩২ কে ইউরেনিয়াম-২৩৩-এ রূপান্তরিত করা হয়, যা তৃতীয় স্তরের ফুয়েল।

ভারতে থোরিয়ামের বিশাল মজুত রয়েছে— কেরালা, তামিলনাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশ, ওড়িশার উপকূলীয় বালুকায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই মজুত দিয়ে ৭০০ বছরেরও বেশি সময় দেশের সমস্ত বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানো সম্ভব শুধুমাত্র থোরিয়াম-ভিত্তিক রিয়্যাক্টর দিয়ে।

ফাস্ট ব্রিডার রিয়্যাক্টর থেকে উচ্চমানের প্লুটোনিয়াম উৎপাদন সম্ভব। প্লুটোনিয়াম আধুনিক নিউক্লিয়ার অস্ত্রের মূল উপাদান। ফ্যাট ম্যান বোমা থেকে শুরু করে আধুনিক হাইড্রোজেন বোমার প্রাইমারি স্টেজেও প্লুটোনিয়াম পিট ব্যবহৃত হয়। ভারতের কাছে বর্তমানে ওয়েপন-গ্রেড প্লুটোনিয়ামের পরিমাণ প্রায় ৭০০ কেজি বলে পশ্চিমা অনুমান। এই নতুন রিয়্যাক্টর চালু হওয়ায় ভবিষ্যতে প্রয়োজন অনুসারে আরও উৎপাদন সম্ভব হবে।

তবে ভারতের মূল লক্ষ্য শান্তিপূর্ণ শক্তি উৎপাদন। তৃতীয় স্তরে ইউরেনিয়াম-২৩৩-এর ব্রিডিং করে অসীম শক্তি নিশ্চিত করা।

সোডিয়াম কুল্যান্ট অত্যন্ত প্রতিক্রিয়াশীল— বাতাসে আগুন ধরে, পানিতে বিস্ফোরণ হয়। রাশিয়ার রিয়্যাক্টরেও বহুবার লিক ও ফায়ার হয়েছে। ভারত এসব শিক্ষা নিয়ে অত্যাধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।

সরকারের রোডম্যাপ অনুসারে ২০৪৭ সালের মধ্যে প্রথম স্তর থেকে ১০০ গিগাওয়াট নিউক্লিয়ার ক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্য। দ্বিতীয় স্তরে আরও দুটি ৫০০ মেগাওয়াট FBR কলপাক্কমে নির্মাণাধীন। তৃতীয় স্তরে অ্যাডভান্সড হেভি ওয়াটার রিয়্যাক্টর ও মল্টেন সল্ট রিয়্যাক্টরের গবেষণা চলছে। কামিনি রিসার্চ রিয়্যাক্টর ইতিমধ্যে U-233 ফুয়েল ব্যবহার করে চলছে।

পশ্চিমা দেশগুলো ইউরেনিয়াম-ভিত্তিক প্রযুক্তি ও নিউক্লিয়ার লবির চাপে FBR প্রযুক্তি ছেড়ে দিয়েছে। ভারতের এই সাফল্য দেখিয়ে দিল যে, ধৈর্য, বিজ্ঞানীদের অধ্যবসায় এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় ভিশন দিয়ে অসম্ভবকে সম্ভব করা যায়। এটি শুধু এনার্জি সিকিউরিটি নয়, বরং ভারতকে একটি শক্তিশালী, স্বনির্ভর ও প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে।

এই মাইলফলক ৭০ বছরের অবিরাম প্রচেষ্টার ফসল। সরকার বদলেছে, নীতি বদলেছে, দেশ যুদ্ধ করেছে, অর্থনৈতিক সংকট এসেছে— কিন্তু প্রোগ্রাম চলেছে। আজ ভারত দ্বিতীয় স্তরে পৌঁছে তৃতীয় স্তরের দিকে এগোচ্ছে। যখন তৃতীয় স্তর পুরোপুরি কার্যকর হবে, তখন ভারতের শক্তি চাহিদা পূরণ হবে সম্পূর্ণ দেশীয় থোরিয়াম দিয়ে— কোনো আমদানির প্রয়োজন ছাড়াই।

এটি শুধু একটি রিয়্যাক্টরের সাফল্য নয়। এটি ভারতীয় বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী ও জাতির সংকল্পের জয়। ড. হোমি ভাবার স্বপ্ন আজ বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। ভারত এখন থোরিয়াম যুগে প্রবেশ করেছে— একটি উজ্জ্বল, শক্তিশালী ও স্বনির্ভর ভবিষ্যতের দিকে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

Recent Comments