ভারত শ্রীলঙ্কার সঙ্গে এনার্জি সহযোগিতা জোরদার করতে একটি স্থলভিত্তিক (ওভারল্যান্ড) তেল পাইপলাইন নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে। এই পাইপলাইন দক্ষিণ ভারত থেকে শ্রীলঙ্কার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ত্রিনকোমালি পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি কলম্বোতে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানিয়েছেন।
ভারতের উপরাষ্ট্রপতি সি.পি. রাধাকৃষ্ণনের দুই দিনের শ্রীলঙ্কা সফরের প্রথম দিনে শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট অনুরা কুমারা দিসানায়েকের সঙ্গে বৈঠকে এই প্রস্তাবটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় ছিল। মিশ্রি বলেন, “দুই দেশের মধ্যে ত্রিনকোমালি এনার্জি হাব প্রকল্প এবং ভারত-শ্রীলঙ্কাকে তেল পাইপলাইনের মাধ্যমে যুক্ত করার প্রস্তাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এখন আর সময় নষ্ট করা যাবে না— এই কৌশলগত প্রকল্পগুলো দ্রুত এগিয়ে নিতে হবে।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বর্তমানে পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট এনার্জি সংকটের সময় এ ধরনের সংযোগের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। যদি এই এনার্জি হাব ইতিমধ্যে চালু থাকত, তাহলে এই সংকট মোকাবিলায় অনেক সুবিধা হতো।
এই প্রকল্পটি ভারত, শ্রীলঙ্কা ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের (UAE) যৌথ উদ্যোগ। ২০২৫ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শ্রীলঙ্কা সফরের সময় তিন দেশের মধ্যে একটি ত্রিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর মাধ্যমে ত্রিনকোমালিকে আঞ্চলিক এনার্জি হাবে পরিণত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
ত্রিনকোমালি শ্রীলঙ্কার একটি প্রাকৃতিক গভীর সমুদ্রবন্দর, যা কৌশলগতভাবে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। এটিকে এনার্জি সিকিউরিটি ও লজিস্টিক্সের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে।
শ্রীলঙ্কা দীর্ঘদিন ধরে এনার্জি সংকট মোকাবিলা করছে। ২০২২ সালের অর্থনৈতিক সংকটের পর দেশটি জ্বালানি সরবরাহে নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী উপায় খুঁজছে। পাইপলাইনের মাধ্যমে ভারত থেকে তেল ও জ্বালানি পণ্য সরবরাহ করলে পরিবহন খরচ কমবে, সরবরাহ নিয়মিত ও নিরাপদ হবে এবং শ্রীলঙ্কার সামগ্রিক এনার্জি নিরাপত্তা বাড়বে।
ভারতের দিক থেকে এটি ‘নেবারহুড ফার্স্ট’ নীতির বাস্তবায়ন। দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি এই প্রকল্প ভারতের এনার্জি রপ্তানি বৃদ্ধি করবে। UAE-এর অংশগ্রহণ প্রকল্পটিকে আর্থিক ও প্রযুক্তিগতভাবে আরও শক্তিশালী করবে।
পররাষ্ট্র সচিব মিশ্রি জোর দিয়ে বলেন যে, উভয় পক্ষই প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে একমত। বৈঠকে এনার্জি হাব ছাড়াও আলোচিত হয়েছে হাউজিং প্রকল্প, মৎস্যজীবীদের সমস্যা সমাধান, বিদ্যুৎ গ্রিড আন্তঃসংযোগ এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও গভীর করার বিষয়গুলো।
পাইপলাইন প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রকৌশলগত, পরিবেশগত ও আর্থিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে স্থলভিত্তিক সংযোগের পরিকল্পনা থাকলেও সমুদ্রের অগভীর অংশ এবং দুই দেশের মধ্যে ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করতে হবে। তবে সফল হলে এটি দক্ষিণ এশিয়ার এনার্জি ল্যান্ডস্কেপ বদলে দিতে পারে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই উদ্যোগ শ্রীলঙ্কাকে সস্তা ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ করবে, ভারতের আঞ্চলিক প্রভাব বাড়াবে এবং তিন দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। প্রকল্পটি এখন ব্যবসায়িক স্তরে বিস্তারিত আলোচনা ও যৌথ কোম্পানি গঠনের পর্যায়ে রয়েছে।
ভারত-শ্রীলঙ্কা সম্পর্ক বর্তমানে ইতিবাচক গতিপথে রয়েছে। এই ধরনের কৌশলগত প্রকল্প দুই দেশের মধ্যে বিশ্বাস ও সহযোগিতাকে আরও মজবুত করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
