যুক্তরাষ্ট্রের ওয়ার ডিপার্টমেন্টের আন্ডার সেক্রেটারি ফর অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড সাসটেইনমেন্ট মাইক ডাফি স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন যে, ভারতের জন্য এখনও আমেরিকার অত্যাধুনিক এফ-৩৫ স্টেলথ ফাইটার জেট কেনার পথ সম্পূর্ণ উন্মুক্ত রয়েছে। এই মন্তব্যটি এমন এক সময়ে এসেছে যখন ভারতীয় বিমানবাহিনী প্রধান যুক্তরাষ্ট্র সফরে রয়েছেন এবং ভারত তার পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের চাহিদা মেটাতে সক্রিয়ভাবে বিকল্প খুঁজছে।
মাইক ডাফির এই বক্তব্য ভারত-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিরক্ষা সম্পর্কের নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি কেবল একটি সাধারণ ঘোষণা নয়, বরং দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত অংশীদারিত্বকে আরও গভীর করার একটি ইতিবাচক সংকেত।
সম্প্রতি একটি অনুষ্ঠানে মাইক ডাফি বলেন,
“ভারতের জন্য এফ-৩৫ অর্জনের পথ এখনও খোলা রয়েছে। আমরা ভারতকে একটি প্রধান প্রতিরক্ষা অংশীদার হিসেবে দেখি এবং উন্নত প্রযুক্তি হস্তান্তরসহ সব ধরনের সহযোগিতায় প্রস্তুত।”
এই মন্তব্যের পর থেকেই আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
ভারতীয় বিমানবাহিনী (IAF) বর্তমানে রাফাল, সুখোই-৩০এমকেআই এবং তেজসের মতো যুদ্ধবিমানের উপর নির্ভরশীল। তবে চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে পঞ্চম প্রজন্মের স্টেলথ যুদ্ধবিমানের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছে। ভারত নিজস্ব অ্যাডভান্সড মিডিয়াম কমব্যাট এয়ারক্রাফট (AMCA) প্রকল্পে কাজ করছে, কিন্তু এটি বাস্তবায়িত হতে এখনও সময় লাগবে। এই ফাঁকে এফ-৩৫ বা রাশিয়ার সু-৫৭-এর মতো বিকল্পগুলো সামনে এসেছে।
লকহিড মার্টিন নির্মিত এফ-৩৫ লাইটনিং টু বিশ্বের সবচেয়ে অত্যাধুনিক মাল্টি-রোল স্টেলথ ফাইটার।
এর বিশেষত্ব:
– অত্যন্ত উন্নত স্টেলথ প্রযুক্তি যা রাডারে ধরা পড়া কঠিন করে।
– সেন্সর ফিউশন ক্ষমতা যা পাইলটকে বাস্তব সময়ে ৩৬০ ডিগ্রি তথ্য প্রদান করে।
– অত্যাধুনিক অস্ত্র বহন ক্ষমতা (এয়ার-টু-এয়ার, এয়ার-টু-গ্রাউন্ড মিসাইল)।
– নেটওয়ার্ক-সেন্ট্রিক ওয়ারফেয়ারে সক্ষমতা, যা অন্যান্য বিমান ও স্থলবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় সাধন করে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইসরায়েল, জাপান, অস্ট্রেলিয়া সহ ২০টির বেশি দেশ এফ-৩৫ পরিচালনা করছে। ভারতের ক্ষেত্রে এটি কিনলে আকাশে চীনের জে-২০ স্টেলথ ফাইটারের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
ভারতের সামনে দুটি বড় বিকল্প রয়েছে—যুক্তরাষ্ট্রের এফ-৩৫ এবং রাশিয়ার সু-৫৭ ই।
এফ-৩৫-এর সুবিধা: অতুলনীয় স্টেলথ ক্ষমতা, ওয়েস্টার্ন প্রযুক্তির সঙ্গে ইন্টারঅপারেবিলিটি (QUAD-এর সদস্য হিসেবে) এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ সহায়তা।
অসুবিধা: উচ্চ মূল্য (প্রতি ইউনিট আনুমানিক ৮-১০ কোটি ডলার), প্রযুক্তি হস্তান্তরের সীমাবদ্ধতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ‘এন্ড-ইউজার মনিটরিং’ শর্ত। ভারত S-৪০০ কিনেছে বলে CAATSA নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কাও রয়েছে।
অন্যদিকে, সু-৫৭-এর ক্ষেত্রে প্রযুক্তি হস্তান্তর ও লাইসেন্সড প্রোডাকশনের সম্ভাবনা বেশি এবং খরচ কম। তবে স্টেলথ ক্ষমতায় এফ-৩৫-এর চেয়ে কিছুটা পিছিয়ে।
ভারত সরকার এখনও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। AMCA প্রকল্পকে প্রাধান্য দিয়ে স্বল্পমেয়াদে সংখ্যা সীমিত রেখে এফ-৩৫ কেনার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে।
গত কয়েক বছরে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। COMCASA, LEAP, iCET এবং QUAD-এর মাধ্যমে দুই দেশ ঘনিষ্ঠ হয়েছে। ২০২৫ সালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতকে এফ-৩৫ অফার করেছিলেন। এখন মাইক ডাফির বক্তব্য সেই প্রস্তাবকে পুনরুজ্জীবিত করল।
ভারতীয় বিমানবাহিনী প্রধানের বর্তমান যুক্তরাষ্ট্র সফরে এফ-৩৫-সহ বিভিন্ন উন্নত প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে বলে জানা গেছে। দুই দেশের মধ্যে জয়েন্ট প্রোডাকশন, টেকনোলজি ট্রান্সফার এবং সাপ্লাই চেইন ডেভেলপমেন্ট নিয়ে কাজ চলছে।
চীনের জে-২০ এবং পাকিস্তানের জে-৩১-এর মতো স্টেলথ হুমকির মুখে এফ-৩৫ ভারতের আকাশ প্রতিরক্ষাকে অনেক শক্তিশালী করবে। এছাড়া এটি QUAD-এর সামরিক সমন্বয় বাড়াবে। তবে ভারত তার ‘মাল্টি-অ্যালাইনমেন্ট’ নীতি বজায় রাখতে চায়, তাই রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কও অটুট রাখবে।
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ এয়ার মার্শাল (অব.) হরজিৎ সিং বলেন, “এফ-৩৫ কেনা হলে ভারতের বিমানবাহিনীর ক্ষমতা এক লাফে বেড়ে যাবে। কিন্তু শর্তাবলী যাতে সার্বভৌমত্বে আঘাত না করে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।”
মাইক ডাফির এই ঘোষণা ভারতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। এফ-৩৫ কেনা হলে ভারত বিশ্বের অত্যাধুনিক বিমানবাহিনীর একটিতে পরিণত হবে। তবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং কৌশলগত স্বাধীনতার ভিত্তিতে।
আগামী মাসগুলোতে ভারতীয় সরকার, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বিমানবাহিনীর আলোচনার উপর নির্ভর করবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। দক্ষিণ এশিয়ার ভারসাম্য রক্ষায় এই সিদ্ধান্তের প্রভাব অনেক দূরপ্রসারী হবে।
