দেশের মধ্যে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) আগামী মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হতে চলেছে। যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের ইতিহাসে অন্যতম দ্রুত অনুমোদন প্রক্রিয়ার পর এই চুক্তি বাস্তবায়নের চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। ২০২৫ সালের ২৪ জুলাই স্বাক্ষরিত এই ব্যাপক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য চুক্তি (CETA) ভারতীয় রপ্তানির ৯৯ শতাংশের জন্য ব্রিটিশ বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করবে। এটি উভয় দেশের অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
চুক্তির খসড়া নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল ব্রেক্সিট-পরবর্তী সময়ে। ২০২২ সাল থেকে দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত আলোচনা চলছিল। অবশেষে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে চূড়ান্ত স্বাক্ষর হয়। যুক্তরাজ্যের বাণিজ্য মন্ত্রকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, “উভয় পক্ষই শেষ কয়েকটি বিষয় নিয়ে কাজ করছে। র্যাটিফিকেশন প্রক্রিয়া অত্যন্ত দ্রুত সম্পন্ন হয়েছে, যা আমাদের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গভীরতা প্রমাণ করে।
চুক্তির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো ভারতীয় পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশ। বস্ত্র, পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, ফার্মাসিউটিক্যালস, আইটি সেবা, কৃষিজাত পণ্য (বিশেষ করে মশলা, চা, কফি), জুয়েলারি ও অটোমোবাইল যন্ত্রাংশের মতো খাতগুলোতে ভারত ব্যাপক সুবিধা পাবে। বর্তমানে ভারত থেকে যুক্তরাজ্যে রপ্তানি হওয়া পণ্যের মধ্যে প্রায় ৯৯ শতাংশই শুল্কমুক্ত হবে। অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যের স্কচ হুইস্কি, চকোলেট, মাংসজাত পণ্য, মেশিনারি ও রাসায়নিক দ্রব্যের জন্য ভারতীয় বাজারও অনেকাংশে উন্মুক্ত হবে।
ভারত সরকারের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এই চুক্তি ভারতের রপ্তানি আয় বাড়াতে সহায়ক হবে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারত-যুক্তরাজ্য দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। চুক্তি কার্যকর হলে এটি ২০৩০ সাল নাগাদ ৫০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
ভারতের জন্য এই চুক্তি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কারণ যুক্তরাজ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে ভারতের অন্যতম বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। গার্মেন্টস শিল্পে কাজ করে এমন লক্ষাধিক শ্রমিকের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। ফার্মাসিউটিক্যাল খাতে জেনেরিক ওষুধ রপ্তানি বৃদ্ধি পাবে। আইটি ও আইটিইএস সেক্টরে সার্ভিস এক্সপোর্টও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
যুক্তরাজ্যের দিক থেকে ভারতের বিশাল বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়বে। ব্রিটিশ কোম্পানিগুলো ভারতে বিনিয়োগ বাড়াতে উৎসাহিত হবে। বিশেষ করে গাড়ি, বিমান, মেডিকেল ডিভাইস ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধি পাবে। যুক্তরাজ্যের বাণিজ্য সচিব বলেছেন, “এই চুক্তি আমাদের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে এবং ভারতের সঙ্গে আমাদের ঐতিহাসিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।”
যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টে চুক্তিটি অসাধারণ দ্রুততায় অনুমোদিত হয়েছে। সাধারণত এ ধরনের চুক্তিতে মাসের পর মাস বিতর্ক চলে। কিন্তু এবার উভয় দেশের রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি এবং অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করেছে। তবে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। ভারতের কৃষক সংগঠনগুলো কৃষিজাত পণ্যের আমদানি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যের কিছু শিল্পগোষ্ঠী সস্তা ভারতীয় পণ্যের প্রতিযোগিতা নিয়ে চিন্তিত।
উভয় দেশই পরিবেশ, শ্রম অধিকার ও বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি সুরক্ষা নিয়ে সাফল্যজনকভাবে আলোচনা সম্পন্ন করেছে। চুক্তিতে ডিজিটাল বাণিজ্য, ডেটা সুরক্ষা এবং টেকসই উন্নয়নের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ভারত ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্কের শেকড় গভীর। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমল থেকে শুরু করে স্বাধীনতার পরও দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য অব্যাহত রয়েছে। ব্রেক্সিটের পর যুক্তরাজ্য নতুন বাণিজ্য চুক্তির খোঁজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ভারতের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর তারই অংশ। এর আগে ভারত অস্ট্রেলিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মরিশাসের সঙ্গে অনুরূপ চুক্তি করেছে। যুক্তরাজ্যের সঙ্গে চুক্তি এই তালিকায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।
চুক্তি কার্যকর হলে ভারতীয় কোম্পানিগুলো যুক্তরাজ্যে বিনিয়োগ বাড়াবে। টাটা গ্রুপ, রিলায়েন্স, মাহিন্দ্রার মতো বড় কর্পোরেটগুলো ইতিমধ্যেই যুক্তরাজ্যে উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। নতুন চুক্তি তাদের আরও সুবিধা দেবে। ছোট ও মাঝারি উদ্যোগ (MSME) খাতও ব্যাপক লাভবান হবে।
অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ভারতের বাজারে সহজ প্রবেশ পাবেন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতাও বৃদ্ধি পাবে। দুই দেশের মধ্যে মানুষ-মানুষ সম্পর্কও মজবুত হবে, কারণ যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী ভারতীয় বংশোদ্ভূত জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ১৮ লক্ষ।
যদিও চুক্তিটি আশাব্যঞ্জক, তবু বাস্তবায়নের সময় কিছু চ্যালেঞ্জ দেখা দিতে পারে। শুল্ক হ্রাসের সঙ্গে সঙ্গে মান নিয়ন্ত্রণ, স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি ব্যবস্থা কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। ভারতকে রপ্তানি মান উন্নয়নে আরও বিনিয়োগ করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তন ও টেকসই বাণিজ্যের বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ।
ভারত-যুক্তরাজ্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন যুগে নিয়ে যাবে। এটি শুধু বাণিজ্য বৃদ্ধিই নয়, বরং কৌশলগত অংশীদারিত্বকে আরও গভীর করবে। মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে যখন এই চুক্তি কার্যকর হবে, তখন ভারতীয় রপ্তানিকারকদের জন্য নতুন দরজা খুলে যাবে। বিশ্বায়নের এই যুগে দুই প্রাচীন সভ্যতার এই মিলন অর্থনৈতিক উন্নয়নের এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে উঠবে।
দুই দেশের সরকার, ব্যবসায়ী সম্প্রদায় ও সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা এই চুক্তির সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে পূরণ হবে বলে আশা করা যায়। ভারতের অর্থনৈতিক উত্থান এবং যুক্তরাজ্যের বৈশ্বিক বাণিজ্য কৌশলের মধ্যে এই চুক্তি একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।
