স্ট্রেইট অব হরমুজে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ এবং ইরান-মধ্যপ্রাচ্য সংকট যখন বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ও সরবরাহ চেইনকে নড়িয়ে দিয়েছে, ঠিক তখন ভারত তার নৌবাহিনীর কৌশলগত সক্ষমতা নিয়ে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ভারতীয় নৌবাহিনীর তৃতীয় স্বদেশীয় নির্মিত পারমাণবিক সাবমেরিন আইএনএস আরিধামনের কমিশনিং দেখিয়ে দিয়েছে যে, উচ্চপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে ভারত দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। কিন্তু একইসঙ্গে সাধারণ ডিজেল-ইলেকট্রিক সাবমেরিন (এসএসকে) নির্মাণে দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা দেশের প্রতিরক্ষা শিল্পের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা তুলে ধরছে। এই বৈপরীত্য ভারতের কৌশলগত স্বাধীনতার সীমা এবং সুযোগ দুটোই দেখাচ্ছে।
আরিহান্ত শ্রেণির এই সাবমেরিনগুলো ভারতের নিউক্লিয়ার ট্রায়াডকে শক্তিশালী করছে। সমুদ্রপথে দ্বিতীয় আঘাতের সক্ষমতা নিশ্চিত করছে। চতুর্থ উন্নত সাবমেরিন এস৪* ২০২৭-২৮ সালের মধ্যে চালু হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই প্রকল্পগুলো প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সরাসরি তত্ত্বাবধানে, ডিআরডিও, পারমাণবিক শক্তি বিভাগ এবং নৌবাহিনীর একটি ছোট, ক্ষমতাসম্পন্ন দলের মাধ্যমে এগিয়েছে। নিরবচ্ছিন্ন অর্থায়ন, দীর্ঘ সময়সীমা এবং ব্যুরোক্র্যাটিক হস্তক্ষেপ থেকে মুক্তি এই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।
কিন্তু একই সময়ে প্রচলিত সাবমেরিন নির্মাণ প্রকল্পগুলো দীর্ঘদিন ধরে আটকে আছে। প্রজেক্ট-৭৫ ইন্ডিয়া ২০০৭ সালে শুরু হয়েছিল। ছয়টি এয়ার ইন্ডিপেন্ডেন্ট প্রপালশন (এআইপি) সমৃদ্ধ সাবমেরিন তৈরির লক্ষ্য ছিল। প্রায় দুই দশক পরেও মাজাগন ডক শিপবিল্ডার্স লিমিটেড এবং জার্মানির থিসেনক্রুপ মেরিন সিস্টেমসের মধ্যে চুক্তি চূড়ান্ত হয়নি। ব্যুরোক্র্যাটিক জটিলতা, পরিবর্তনশীল প্রয়োজনীয়তা এবং ঝুঁকি এড়ানোর মানসিকতা এর প্রধান কারণ। নৌবাহিনীর প্রাক্তন প্রধান অ্যাডমিরাল অরুণ প্রকাশ বলেছেন, ভারতের প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান ঝুঁকি নিতে অনিচ্ছুক। ব্যর্থতাকে উন্নয়নের অংশ হিসেবে মেনে নিতে পারে না। ফলে কর্মকর্তারা নিরাপদ বিদেশি প্ল্যাটফর্মের দিকে ঝুঁকছেন।
একজন নৌসেনা কর্মকর্তা এই বৈপরীত্যকে তুলনা করে বলেছেন, পারমাণবিক সাবমেরিন তৈরি করা যেন ফর্মুলা ওয়ান গাড়ি বানানো, আর সাধারণ সাবমেরিন যেন উন্নত এসইউভি। প্রথমটিতে সাফল্য আসছে, দ্বিতীয়টিতে স্থবিরতা। এই গ্যাপ প্রতিরক্ষা শিল্পের সাংগঠনিক দুর্বলতা প্রকাশ করে।
প্রপালশন সিস্টেম এখানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ডিজেল ইঞ্জিন, ব্যাটারি এবং এআইপি সিস্টেমের সমন্বয় ভারতে এখনও পুরোপুরি স্বদেশীয় নয়। ডিআরডিওর এআইপি সিস্টেম পরীক্ষামূলক পর্যায়ে আছে। লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি প্রযুক্তিতেও পিছিয়ে আছে দেশ। শব্দ নিয়ন্ত্রণ এবং স্টেলথ ক্ষমতা বাড়ানো আরও কঠিন।
এই প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আরিহান্ত শ্রেণির সাবমেরিনের চাপা আলোকিত পানির রিঅ্যাক্টর মিনিয়েচারাইজেশনে রাশিয়ান বিশেষজ্ঞদের অবদান ছিল মৌলিক। ১৯৭০-এর দশক থেকে শুরু হয়ে ১৯৮৮ সালে চার্লি আই শ্রেণির সাবমেরিন লিজ, পরবর্তীতে আকুলা শ্রেণির চার্কা — এসব অভিজ্ঞতা আরিহান্ত প্রকল্পকে এগিয়ে নিয়েছে। ২০১৫ সালে অনুমোদিত ৩-৫টি স্বদেশীয় অ্যাটাক সাবমেরিন (এসএসএন) প্রকল্পেও রাশিয়ান সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। ইউক্রেন যুদ্ধ এবং নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও এই অংশীদারিত্ব কৌশলগতভাবে অটুট।
হরমুজ অবরোধের মধ্যে এই নৌশক্তির গুরুত্ব আরও বেড়েছে। ভারত মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল আমদানির ওপর নির্ভরশীল। অবরোধের ফলে সরবরাহ চেইন চাপে পড়েছে। তেল ও সারের দাম বেড়েছে। কিন্তু ভারত একইসঙ্গে আরব দেশগুলোতে খাদ্য রপ্তানিতে শীর্ষস্থান দখল করেছে। ব্রাজিলকে টপকে ১৫ বছর পর প্রথম স্থানে উঠেছে। ফল, সবজি, চিনি, শস্য ও মাংসের দ্রুত সরবরাহ ভারতের ভৌগোলিক সুবিধা দেখিয়েছে। মার্চ মাসে বাণিজ্য ঘাটতি কমেছে। আমেরিকায় রপ্তানি বেড়েছে ১৭ শতাংশ।
নেপালের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করাও এই কৌশলের অংশ। প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহের সফরে নতুন প্রকল্প, এমওইউ এবং আরোগ্য বাটিকার মতো উদ্যোগ আসছে। স্বাস্থ্য, আয়ুষ ও বাণিজ্যে সহযোগিতা বাড়বে।
নতুন গ্রেট গেমে ভারতের অবস্থান স্পষ্ট হচ্ছে। হরমুজ বন্ধে চীনের মালাক্কা ডাইলেমা আরও তীব্র হয়েছে। আমেরিকা জ্বালানি নিরাপত্তায় লাভবান হচ্ছে। ভারতকে এই পরিস্থিতিতে সাবমেরিন বহরকে শক্তিশালী করতে হবে। ২৪টি সাবমেরিনের লক্ষ্য থেকে পিছিয়ে আছে দেশ। এসএসকে-এর ঘাটতি পূরণ না করলে ভারতীয় মহাসাগরীয় অঞ্চলে প্রভাব কমবে।
প্রতিরক্ষা শিল্পে সংস্কার জরুরি। ঝুঁকি নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। প্রপালশন, ব্যাটারি এবং স্টেলথ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে হবে। রাশিয়ার সঙ্গে অংশীদারিত্ব বজায় রেখে ফ্রান্স, জার্মানি এবং অন্যান্য দেশের সঙ্গেও প্রযুক্তি হস্তান্তর চুক্তি করতে হবে।
ইরান সংকট দেখিয়ে দিয়েছে যে, সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণ কতটা গুরুত্বপূর্ণ। ভারতকে নিজস্ব নৌশক্তি বাড়িয়ে মুক্ত নৌচলাচল নিশ্চিত করতে হবে। পারমাণবিক সাবমেরিনের সাফল্যকে সাধারণ সাবমেরিন নির্মাণে প্রয়োগ করতে হবে। তবেই ভারত বিশ্বের একটি শক্তিশালী নৌশক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে।
এই সংকটের মধ্যেও ভারতের খাদ্য রপ্তানি, বাণিজ্য বৈচিত্র্যকরণ এবং প্রতিবেশী সম্পর্ক জোরদার করা দেখাচ্ছে যে, দেশ সুযোগকে কাজে লাগাতে পারছে। প্রতিরক্ষা খাতে একই দূরদর্শিতা দেখাতে হবে। ট্রাম্প ডকট্রিন এবং নতুন গ্রেট গেমের যুগে ভারতকে স্বাধীন ও শক্তিশালী অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। নৌবাহিনীর আধুনিকীকরণ এই যাত্রার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
ভারতের প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান যদি পারমাণবিক সাবমেরিনের মতো করে সাধারণ সাবমেরিনও তৈরি করতে পারে, তাহলে দেশের কৌশলগত স্বাধীনতা আরও মজবুত হবে। রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘদিনের অংশীদারিত্বকে কাজে লাগিয়ে এবং নিজস্ব গবেষণা বৃদ্ধি করে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। হরমুজের অবরোধ শুধু তেলের সংকট নয়, এটি ভারতকে তার নৌশক্তি পুনর্বিবেচনার সুযোগ করে দিয়েছে। এই সুযোগকে কাজে লাগাতে হবে দ্রুত এবং দৃঢ়ভাবে।
