Monday, April 20, 2026
HomeEditorials, Opinion & Strategic Analysisনামের লড়াই: বেইজিংয়ের আখ্যান-যুদ্ধে ভারতের নীরবতা আর কতদিন?

নামের লড়াই: বেইজিংয়ের আখ্যান-যুদ্ধে ভারতের নীরবতা আর কতদিন?

মানচিত্রে একটি নাম পরিবর্তন করতে কতটুকু সময় লাগে? মাত্র কয়েক মিনিট। কিন্তু সেই পরিবর্তন যদি একটু একটু করে ইতিহাসকে মুছে দিতে থাকে, একটি সভ্যতার শিকড়কে অস্বীকার করতে থাকে — তাহলে ক্ষতিটা শুধু কাগজে-কলমে থাকে না, ঢুকে পড়ে মানুষের স্মৃতিতে, প্রজন্মের পর প্রজন্মের চেতনায়। চীন ঠিক এই কাজটিই করে আসছে — পদ্ধতিগতভাবে, ধীরে ধীরে, কিন্তু অত্যন্ত সুচিন্তিতভাবে। আর ভারত? ভারত এখনও মূলত প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে, উদ্যোগ নিচ্ছে না।

এখানে একটু থামা দরকার। কারণ এই আলোচনার শুরুটা সঠিক জায়গা থেকে করতে না পারলে পুরো বিষয়টা ঘোলাটে থেকে যাবে। আজকের “চীন” নামক রাষ্ট্রটি কোনো প্রাচীন, স্বাভাবিকভাবে বিকশিত সভ্যতার অবিচ্ছিন্ন উত্তরসূরি নয়। একটি সভ্যতাগত চীন অবশ্যই আছে এবং ছিল। কিন্তু আজকের রাজনৈতিক চীন হলো বিংশ শতাব্দীর একটি নির্মাণ — কমিউনিস্ট বিপ্লব, সামরিক অভিযান এবং জোরপূর্বক একত্রীকরণের মাধ্যমে তৈরি হওয়া একটি কৃত্রিম কাঠামো। ঐতিহাসিকভাবে চীনা রাজনীতি ছিল হান জাতিকেন্দ্রিক। অথচ ধীরে ধীরে তার মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন জাতি, ভিন্ন পরিচয়ের অঞ্চলগুলো — তিব্বত, শিনজিয়াং, ইনার মঙ্গোলিয়া। এগুলো স্বেচ্ছায় যোগ দেয়নি। এগুলোকে শক্তি দিয়ে গ্রাস করা হয়েছে, এবং আজও সামরিক নিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিক শোষণ ও জনতাত্ত্বিক পরিবর্তনের মাধ্যমে ধরে রাখা হয়েছে।

ভৌগোলিকভাবে দেখলে চীনের ভূখণ্ডের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই মূলত অ-হান অঞ্চল। শিনজিয়াং একাই ফ্রান্সের তিনগুণ বড় এবং চীনের মোট ভূখণ্ডের প্রায় এক-ষষ্ঠাংশ। তিব্বতি মালভূমি থেকে এশিয়ার বড় বড় নদীগুলো উৎপত্তি পেয়েছে — সেদিক থেকে এটি কৌশলগতভাবে এশিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ডগুলোর একটি। ইনার মঙ্গোলিয়া চীনের প্রায় ১২ শতাংশ ভূমি এবং সেখান থেকে প্রায় এক-চতুর্থাংশ কয়লা উৎপাদিত হয়। কিন্তু এই অঞ্চলগুলোর মানুষ কী পাচ্ছে? পাচ্ছে পরিবেশ বিপর্যয়, সাংস্কৃতিক দমন এবং পরিচয় হারানোর যন্ত্রণা।

সহজভাবে বললে, যে রাষ্ট্র নিজেই অন্যের ভূমি জোর করে দখল করে আছে, সে অন্যের ভূমিতে দাবি জানাচ্ছে। এই দ্বন্দ্বটি আন্তর্জাতিক মঞ্চে আরও জোরে তুলে ধরা দরকার ছিল। ভারত সেটা করেনি।

তবে এই প্রশ্নের আরেকটি গভীর দিক আছে, যেটা নিয়ে আলোচনা প্রায়ই হয় না। চীন আজ যে অঞ্চলগুলো নিজের বলে দাবি করছে, সেগুলোর সঙ্গে ভারতীয় সভ্যতার সম্পর্ক শতাব্দীর নয়, সহস্রাব্দের। খ্রিস্টপূর্ব যুগেই শিনজিয়াং তথা তারিম অববাহিকার অঞ্চলগুলো ছিল সংস্কৃত সংস্কৃতির বিস্তারভূমি। কুচা ছিল বৌদ্ধ শিক্ষার প্রধান কেন্দ্র, এবং সেখান থেকেই ভারতীয় সঙ্গীত চীনে পৌঁছেছিল। ইয়ারকন্দ ও খোটান ছিল মহাযান বৌদ্ধ ধর্মের কেন্দ্র। কাশগর, কুচা ও তুরফান ছিল হীনযানের ঘাঁটি।

কুমারজীবের কথা মনে পড়ছে — ৩৪৪ থেকে ৪১৩ খ্রিস্টাব্দে জীবিত এই মহাজ্ঞানী সংস্কৃত পণ্ডিত ও অনুবাদকের বাবা ছিলেন কাশ্মীরি, মা ছিলেন কুচান। তিনি বৌদ্ধ ধর্ম পড়েছিলেন কাশ্মীরে, কিন্তু বেদ পড়তে গিয়েছিলেন আজকের শিনজিয়াংয়ের কাশগরে। এই তথ্যটুকু একটু ভেবে দেখলেই বোঝা যায় — সেই সময় কাশগর কতটা ভারতীয় ছিল।

পুরাণে এবং মহাভারত-রামায়ণে “উত্তরকুরু” ও “ভদ্রাশ্ব” নামে যে অঞ্চলগুলোর উল্লেখ আছে, ঐতিহাসিক হেমচন্দ্র রায়চৌধুরীর মতে সেগুলো আজকের শিনজিয়াং এবং উত্তর চীনের অঞ্চলের সঙ্গে মিলে যায়। তারিম অববাহিকায় পাওয়া প্রাচীন খরোষ্ঠী লিপি এবং ভাষাতাত্ত্বিক প্রমাণ ভারতীয় উপস্থিতির সুস্পষ্ট সাক্ষী। মঙ্গোলিয়ার ধর্মীয় ঐতিহ্যেও মহাকাল অর্থাৎ শিবের একটি রূপ, কার্তিকেয়, ব্রহ্মা, যম, হয়গ্রীব ও কুবেরের কেন্দ্রীয় ভূমিকা ছিল। চেঙ্গিস খানের পতাকায় শিবের ত্রিশূল ছিল বলেও উল্লেখ আছে।

এই ইতিহাস কোথাও কাল্পনিক নয়। এটা নথিবদ্ধ, গবেষণাসিদ্ধ এবং যাচাইযোগ্য। তবু ভারত এই ইতিহাসকে কূটনৈতিক ও সাংস্কৃতিক হাতিয়ার হিসেবে সক্রিয়ভাবে ব্যবহার করেনি।

এখন আসা যাক চীনের নামকরণ-যুদ্ধের প্রসঙ্গে। চীন ২০১৭ সালে তিব্বতের ছয়টি জায়গার নাম পরিবর্তন করেছে। ২০২১ সালে ১৫টি। ২০২৩ সালে আরও ১১টি। প্রতিটি নাম পরিবর্তন একটি বার্তা পাঠায় — এটা আমাদের, এটা সবসময় আমাদের ছিল। অরুণাচল প্রদেশকে “জাংনান” বা “দক্ষিণ তিব্বত” বলে চীন যে দাবি করে, সেটা শুধু কূটনৈতিক উস্কানি নয়, এটা একটি আখ্যান প্রতিষ্ঠার কৌশল। একবার কোনো নাম চালু হয়ে গেলে, সেই নামের পেছনের ইতিহাসও ধীরে ধীরে গ্রহণযোগ্যতা পায়। মানচিত্রের নাম বদলায়, তারপর ইতিহাসের বই বদলায়, তারপর মানুষের মনে বদলায়।

ভারত এ পর্যন্ত এই চ্যালেঞ্জের মুখে মূলত প্রতিবাদ করেছে। প্রতিবাদ জরুরি, কিন্তু যথেষ্ট নয়। চীন যে মাঠে খেলছে, সেই মাঠে না নামলে শুধু প্রতিবাদ দিয়ে কিছু হবে না। ভারতের এখন দরকার একটি সুচিন্তিত, ঐতিহাসিকভাবে সুদৃঢ় পাল্টা কৌশল।

সেই কৌশলের শুরুটা হতে পারে নামকরণ দিয়েই। শিনজিয়াংয়ের প্রাচীন নামগুলো — খোটান, কাশগর, কুচা, ইয়ারকন্দ, তুরফান — এগুলো কোনো মনগড়া নাম নয়, এগুলো ইতিহাসের অংশ। পুরো অঞ্চলটিকে “ভদ্রাশ্ব” বলা যেতে পারে, যার ভিত্তি সাহিত্যিক প্রমাণে। তিব্বতকে “জিজাং” বলার চীনা প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে শুধু প্রতিবাদ নয়, ভারতের উচিত তিব্বতকে “ত্রিবিষ্টপ” নামে উল্লেখ শুরু করা — এই সংস্কৃত নামটি রামায়ণ ও মহাভারতে আছে এবং সেখান থেকেই “তিব্বত” শব্দটি এসেছে বলে মনে করা হয়।

এটা করা মানে মিথ্যা দাবি করা নয়। ভারতের কাছে যথেষ্ট ঐতিহাসিক প্রমাণ আছে। কমতি হলো দৃঢ়তা। ইতিহাস আছে, কিন্তু সেই ইতিহাসকে সক্রিয়ভাবে ব্যবহার করার রাজনৈতিক সদিচ্ছা এখনও পর্যাপ্ত নয়।

এই প্রশ্নটাও মাথায় রাখা দরকার — ১৯১৩-১৪ সালে সিমলা সম্মেলনে তিব্বত, ভারত ও চীন সমান মর্যাদায় বসেছিল আলোচনার টেবিলে। সেই তিব্বতের সঙ্গে ভারতের ঐতিহাসিক সংযোগের বিষয়টি আজ প্রায় বিস্মৃত। শিনজিয়াং আর ইনার মঙ্গোলিয়ার সঙ্গে ভারতের সভ্যতাগত সম্পর্কের কথা তো আরও অনালোচিত।

আখ্যান-যুদ্ধে পিছিয়ে থাকার পরিণতি দীর্ঘমেয়াদী। ভূখণ্ডের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আগে আসে আখ্যানের ওপর নিয়ন্ত্রণ। এটা চীন ভালো করেই জানে। একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যায়, চীনের প্রতিটি নামকরণ প্রচেষ্টা বিচ্ছিন্ন নয়, সেগুলো একটি দীর্ঘমেয়াদী কৌশলের অংশ — বিশ্বের সামনে একটি নির্দিষ্ট ভূ-ইতিহাস প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে বিতর্কিত অঞ্চলগুলো স্বাভাবিকভাবেই চীনের অংশ হয়ে যায়।

ভারতের সম্পদ এই ক্ষেত্রে চীনের চেয়ে কম নয়, বরং বেশি। সংস্কৃত সাহিত্য, পুরাণ, মহাকাব্য, ঐতিহাসিক গবেষণা — এত বিশাল তথ্যভাণ্ডার ভারতের কাছে আছে যেটা পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়নি। ভারতকে কিছু উদ্ভাবন করতে হবে না, শুধু যা আছে তা সাহসের সঙ্গে তুলে ধরতে হবে।

শেষ পর্যন্ত এটা শুধু কূটনীতির প্রশ্ন নয়, সভ্যতার প্রশ্ন। চীন একটি কৃত্রিম আখ্যান দিয়ে ঐতিহাসিক সত্যকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে। ভারতের কাছে আছে প্রকৃত ইতিহাস, আছে প্রমাণ, আছে সভ্যতার সুদীর্ঘ স্মৃতি। এই শক্তিকে সক্রিয়, সুসংগঠিত এবং কৌশলগতভাবে প্রয়োগ করার সময় এসেছে। নীরবতা আর বিনয় যখন দুর্বলতা হিসেবে পড়া হয়, তখন জবাব দেওয়াটাই বিচক্ষণতা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

Recent Comments