Tuesday, April 21, 2026
HomeWorld Geopolitics & Military Affairsআমেরিকা ইরানের রিভার্স-ইঞ্জিনিয়ার্ড ড্রোন ব্যবহার করে ইরানের বিরুদ্ধে ধ্বংসাত্মক আঘাত হানছে।

আমেরিকা ইরানের রিভার্স-ইঞ্জিনিয়ার্ড ড্রোন ব্যবহার করে ইরানের বিরুদ্ধে ধ্বংসাত্মক আঘাত হানছে।

আধুনিক যুদ্ধের ধরন বদলে দিচ্ছে সস্তা ও কার্যকর ড্রোন প্রযুক্তি। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তি যুক্তরাষ্ট্র এখন ইরানের তৈরি শাহেদ-১৩৬ (Shahed-136) আত্মঘাতী ড্রোনের নকশা রিভার্স-ইঞ্জিনিয়ারিং করে তৈরি করা নিজস্ব ড্রোন ব্যবহার করে ইরানের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে একের পর এক সফল আক্রমণ চালাচ্ছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে, যা আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

এই নতুন আমেরিকান ড্রোনের নাম FLM-১৩৬ বা LUCAS (Low-Cost Uncrewed Combat Attack System)। অ্যারিজোনা-ভিত্তিক প্রতিরক্ষা কোম্পানি SpektreWorks এটি তৈরি করেছে। মার্কিন সেনাবাহিনী কয়েক বছর আগে ক্যাপচার করা ইরানের শাহেদ-১৩৬ ড্রোনের প্রযুক্তি বিশ্লেষণ করে এই ড্রোনটি উন্নয়ন করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, LUCAS ড্রোন ইরানের সামরিক টার্গেটগুলোকে “ধ্বংস করে দিচ্ছে” এবং এটি “টয়োটা করোল্লা অফ ড্রোন” হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে — অর্থাৎ সস্তা, সহজে উৎপাদনযোগ্য এবং অত্যন্ত কার্যকর।

ইরানের শাহেদ-১৩৬ ড্রোন দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও তার মিত্রদের হয়ে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এটি একটি লো-কস্ট লং-রেঞ্জ লোয়েটারিং মিউনিশন (one-way attack drone), যা সস্তায় তৈরি করা যায় এবং দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম। রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধে এই ড্রোনের নকশা অনুসরণ করে নিজস্ব সংস্করণ তৈরি করে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছে। এখন যুক্তরাষ্ট্রও একই পথ অনুসরণ করছে। এটি অনেক বিশ্লেষকের কাছে ইরানের ড্রোন প্রযুক্তির পরোক্ষ স্বীকৃতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

LUCAS ড্রোনের খরচ প্রতি ইউনিট মাত্র ৩৫,০০০ ডলার। তুলনায় আমেরিকার অন্যান্য উন্নত অস্ত্র ব্যবস্থা যেমন হেলফায়ার মিসাইল বা অন্যান্য প্রিসিশন গাইডেড মিউনিশনের খরচ লক্ষাধিক ডলার। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM)-এর অধীনে গঠিত নতুন টাস্ক ফোর্স Scorpion Strike-এর মাধ্যমে এই ড্রোনগুলো মোতায়েন করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুসারে, চলমান ইরান-সংক্রান্ত অভিযানের শুরু থেকেই LUCAS ড্রোন ইরানের সামরিক ঘাঁটি, রাডার স্টেশন এবং অন্যান্য লক্ষ্যবস্তুতে সফলভাবে আঘাত হানছে।

SpektreWorks কোম্পানি আগে FLM-১৩৬ নামে একটি টার্গেট ড্রোন তৈরি করেছিল, যা ইরানের শাহেদ ড্রোনের অনুকরণে কাউন্টার-ড্রোন প্রশিক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হতো। পরবর্তীতে এটিকে যুদ্ধক্ষেত্রের জন্য উন্নয়ন করা হয়েছে। LUCAS ড্রোনটি শাহেদ-১৩৬-এর মতো দেখতে হলেও কিছুটা ছোট — দৈর্ঘ্য প্রায় ১০ ফুট এবং উইংস্প্যান ৮ ফুট। এর রেঞ্জ কিছুটা কম (প্রায় ৪০০ মাইল), কিন্তু ওয়ারহেড পেলোড ১৮ কেজি, যা একটি হেলফায়ার মিসাইলের দ্বিগুণ। এটি ক্যাটাপল্ট, রকেট-অ্যাসিস্টেড টেকঅফ বা মোবাইল গ্রাউন্ড সিস্টেম থেকে লঞ্চ করা যায়।

ইরানি মিডিয়া দাবি করেছে যে তাদের বাহিনী কয়েকটি LUCAS ড্রোন গুলি করে ভূপাতিত করেছে। একটি ভিডিওতে ক্ষতিগ্রস্ত LUCAS ড্রোন দেখানো হয়েছে, যা কাতারের কাছে কেশম দ্বীপের কাছে পড়ে গেছে বলে জানানো হয়। তবে মার্কিন বাহিনী এখনো এসব দাবির বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া দেয়নি। পেন্টাগন নিশ্চিত করেছে যে LUCAS ড্রোন ইরানের বিরুদ্ধে প্রথমবারের মতো যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে।

এই ঘটনা আধুনিক যুদ্ধের একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ঐতিহ্যগতভাবে যুক্তরাষ্ট্র অত্যাধুনিক, ব্যয়বহুল অস্ত্রের উপর নির্ভর করত। কিন্তু ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দেখিয়ে দিয়েছে যে সস্তা, ব্যাপক উৎপাদনযোগ্য ড্রোনগুলো যুদ্ধের ভারসাম্য বদলে দিতে পারে। ইরানের শাহেদ ড্রোনগুলোর সাফল্যের কারণেই রাশিয়া এবং এখন আমেরিকা এই প্রযুক্তি অনুসরণ করছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের ড্রোন প্রযুক্তি মূলত ১৯৮০-এর দশক থেকে শুরু হয়েছে। যদিও শাহেদ-১৩৬-এ আমেরিকান উপাদান (যেমন জিপিএস ও মাইক্রোচিপ) পাওয়া গেছে, তবু ইরান এটিকে স্থানীয়ভাবে উন্নয়ন ও উৎপাদনে সক্ষম হয়েছে। এখন যুক্তরাষ্ট্র এই প্রযুক্তি নিয়ে আরও উন্নত সংস্করণ তৈরি করছে। কেউ কেউ এটিকে “ইরানকে তার নিজের ওষুধ খাওয়ানো” বলে বর্ণনা করছেন।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতে এই ড্রোনের ব্যবহার নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ইরানের প্রক্সি গ্রুপগুলো (যেমন হুথি, হিজবুল্লাহ) শাহেদ ড্রোন ব্যবহার করে লোহিত সাগর ও অন্যান্য অঞ্চলে আক্রমণ চালাচ্ছে। তার বিপরীতে আমেরিকা এখন একই ধরনের সস্তা ড্রোন ব্যবহার করে পাল্টা আঘাত করছে। এতে যুদ্ধের খরচ কমছে এবং আক্রমণের সংখ্যা বাড়ানো যাচ্ছে।

তবে এই প্রযুক্তি হস্তান্তরের ঝুঁকিও রয়েছে। রিভার্স-ইঞ্জিনিয়ারিং-এর মাধ্যমে প্রযুক্তি ছড়িয়ে পড়লে ভবিষ্যতে অন্যান্য দেশও এটি ব্যবহার করতে পারে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, ভবিষ্যতের যুদ্ধে ড্রোন সোয়ার্ম (দলবদ্ধ ড্রোন আক্রমণ), অটোনোমাস সিস্টেম এবং লো-কস্ট মিউনিশনের ভূমিকা আরও বাড়বে। যুক্তরাষ্ট্র এখন ম্যাস প্রোডাকশনের দিকে মনোনিবেশ করছে যাতে যেকোনো সংঘাতে দ্রুত বড় সংখ্যায় ড্রোন মোতায়েন করা যায়।

ইরানের দিক থেকে এটি একটি চ্যালেঞ্জ। তারা তাদের ড্রোন প্রযুক্তিকে আরও উন্নত করার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে তারা দাবি করছে যে তাদের এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম LUCAS-এর মতো ড্রোনগুলোকে আটকাতে সক্ষম। তবে বাস্তবে শাহেদ ড্রোনের সাফল্য দেখে মনে হয় এই ধরনের সস্তা ড্রোনগুলো আধুনিক এয়ার ডিফেন্সের জন্যও চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

এই ঘটনা বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোর জন্যও শিক্ষণীয়। ভারতসহ অনেক দেশ এখন লো-কস্ট ড্রোন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। চীন এবং রাশিয়া ইতোমধ্যে এই ক্ষেত্রে অগ্রসর। যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ দেখিয়ে দিচ্ছে যে যুদ্ধক্ষেত্রে উদ্ভাবন সবসময় নতুন প্রযুক্তি তৈরি করা নয়, বরং বিদ্যমান প্রযুক্তিকে দ্রুত অভিযোজিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

সার্বিকভাবে, LUCAS ড্রোনের সাফল্য ইরানের শাহেদ ড্রোনের প্রযুক্তিগত দক্ষতার একটি স্বীকৃতি। একই সঙ্গে এটি দেখাচ্ছে যে আধুনিক যুদ্ধে খরচ-কার্যকারিতা (cost-effectiveness) কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভবিষ্যতে ড্রোন যুদ্ধের ধরন আরও বদলে যাবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত শুধু রাজনৈতিক নয়, প্রযুক্তিগত দিক থেকেও একটি টার্নিং পয়েন্ট হতে পারে।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুসারে, এই ড্রোনগুলোর ব্যবহার চলমান অভিযানে “অসাধারণভাবে কার্যকর” প্রমাণিত হয়েছে। যেখানে ব্যয়বহুল সিস্টেমগুলো সীমিত সাফল্য পাচ্ছে, সেখানে LUCAS সহজে উৎপাদিত হয়ে বড় সংখ্যায় আক্রমণ চালাতে সক্ষম। এটি যুদ্ধের অর্থনীতিকেও বদলে দিচ্ছে।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের এই নতুন অধ্যায় দেখিয়ে দিচ্ছে যে প্রযুক্তি কোনো একটি দেশের একচেটিয়া নয়। বরং যে দেশ দ্রুত শিখতে ও অভিযোজিত হতে পারে, সেই এগিয়ে থাকে। ভবিষ্যতে এই ধরনের ড্রোন সোয়ার্ম আক্রমণ, অটোনোমাস নেভিগেশন এবং কাউন্টার-মেজারের মধ্যে একটি নতুন প্রতিযোগিতা শুরু হতে পারে।

সূত্র: ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

Recent Comments