Monday, April 20, 2026
HomeUncategorizedইরান ইস্যুতে পশ্চিমের বিপরীতে ভারত: জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে ভারতের ‘না’ ভোটের নেপথ্য...

ইরান ইস্যুতে পশ্চিমের বিপরীতে ভারত: জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে ভারতের ‘না’ ভোটের নেপথ্য কূটনীতি।

জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে ইরানের বিরুদ্ধে আনা পশ্চিমা সমর্থিত প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দিয়ে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে ভারতের পররাষ্ট্রনীতি। শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের ৩৯তম বিশেষ অধিবেশনে এই প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেয় ভারত। চীন, পাকিস্তানসহ মোট ছয়টি দেশ ভারতের সঙ্গে এই অবস্থান নেয়।

প্রস্তাবটি ২৫–৭ ভোটে গৃহীত হয়, যেখানে ১৪টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে। এতে ইরানে দেশজুড়ে চলা বিক্ষোভ দমনে রাষ্ট্রীয় সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানানো হয় এবং সেখানে ঘটে যাওয়া মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য আন্তর্জাতিক তদন্ত জোরদার করার আহ্বান জানানো হয়।

এই প্রস্তাবে ইরান সংক্রান্ত স্বাধীন আন্তর্জাতিক ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশনের মেয়াদ আরও দুই বছরের জন্য বাড়ানো হয়েছে এবং বিশেষ র‌্যাপোর্টিয়রের মেয়াদ এক বছরের জন্য নবায়ন করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিচারবহির্ভূত হত্যা, জোরপূর্বক গুম, নির্বিচার গ্রেপ্তার, যৌন সহিংসতা ও নির্যাতনের অভিযোগের জরুরি তদন্তের দাবি জানানো হয়।

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার টুর্ক পরিষদকে জানান, ইরানের সাম্প্রতিক দমন-পীড়নে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে, যার মধ্যে শিশুদের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। তাঁর ভাষায়, এটি ছিল “নির্মম ও পরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় দমন”।

তবুও এই প্রস্তাবের বিপক্ষে অবস্থান নেয় ভারত। এটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ, এই প্রথমবার ভারত ইরান সংক্রান্ত কোনো তদন্তমূলক সংস্থার বিরুদ্ধে জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে সরাসরি ‘না’ ভোট দিল। এর আগে ২০২২ সালের নভেম্বর এবং ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে একই ধরনের প্রস্তাবে ভারত ভোটদানে বিরত ছিল।

ইরানের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ ফাথালি প্রকাশ্যে ভারতের এই অবস্থানের জন্য ধন্যবাদ জানান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, ভারতের ভোট ন্যায়বিচার, বহুপাক্ষিকতা এবং জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রতি তাদের প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন। তাঁর মতে, এই প্রস্তাব ছিল অন্যায় ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, যা ইরান আগেই প্রত্যাখ্যান করেছে।

ভারতের এই অবস্থানের পেছনে একাধিক স্তরের কূটনৈতিক ও কৌশলগত কারণ রয়েছে। প্রথমত, ভারত ঐতিহাসিকভাবেই জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে দেশভিত্তিক বা “কান্ট্রি-স্পেসিফিক” প্রস্তাবের বিরোধিতা করে এসেছে। ভারতের যুক্তি, এ ধরনের প্রস্তাব অনেক সময় মানবাধিকার রক্ষার চেয়ে রাজনৈতিক চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

নতুন দিল্লির মতে, মানবাধিকার প্রশ্নে আলোচনা হওয়া উচিত সর্বজনীন কাঠামোর মধ্যে, নির্দিষ্ট দেশকে আলাদা করে টার্গেট না করে। এই নীতিগত অবস্থান ভারতের পররাষ্ট্রনীতির একটি দীর্ঘস্থায়ী অংশ।

তবে নীতিগত অবস্থানের পাশাপাশি বাস্তব কূটনৈতিক হিসাবও এই সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে চাবাহার বন্দরের বিষয়টি এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইরানের চাবাহার বন্দর ভারতের জন্য শুধু একটি বাণিজ্যিক প্রকল্প নয়, বরং এটি আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ার সঙ্গে ভারতের সংযোগের কৌশলগত দরজা।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্র চাবাহার সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা ছাড় প্রত্যাহার করে নেয়। পরে ভারত ছয় মাসের জন্য একটি শর্তসাপেক্ষ ছাড় পায়, যার মেয়াদ শেষ হবে ২৬ এপ্রিল। এই সময়ের মধ্যে ভারতকে অত্যন্ত সতর্কভাবে ইরান ও পশ্চিমা শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে।

এই চাপ আরও বেড়ে যায় ১২ জানুয়ারি, যখন Donald Trump ঘোষণা দেন যে, ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা যেকোনো দেশের ওপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হতে পারে। এই হুমকি ভারতের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা ছিল।

একদিকে ভারতের যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্ব রয়েছে, অন্যদিকে ইরান ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা বর্তমানে ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

ভারতের ‘না’ ভোট তাই ইরানের সব কর্মকাণ্ডের প্রতি সমর্থন হিসেবে দেখা হচ্ছে না। বরং এটি একটি সূক্ষ্ম বার্তা—ভারত মানবাধিকার লঙ্ঘনকে সমর্থন না করলেও, জাতিসংঘ মঞ্চে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত চাপের রাজনীতিতে অংশ নিতে চায় না।

এছাড়া, দক্ষিণ এশিয়া ও পশ্চিম এশিয়ায় ক্রমবর্ধমান অস্থিরতার মধ্যে ভারত নিজেকে এমন এক অবস্থানে রাখতে চায়, যেখানে ভবিষ্যতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নেওয়ার সুযোগ থাকে। প্রকাশ্যে কোনো এক পক্ষের সঙ্গে দাঁড়িয়ে গেলে সেই কূটনৈতিক স্পেস সংকুচিত হয়ে যায়।

সব মিলিয়ে, জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে ভারতের এই ভোট একটি সাধারণ মানবাধিকার অবস্থান নয়, বরং একটি গভীর কৌশলগত সিদ্ধান্ত। এটি দেখিয়ে দিল যে, বর্তমান বৈশ্বিক মেরুকরণের যুগে ভারত নিজের স্বার্থ, নীতি ও কূটনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রেখেই এগোতে চাইছে।

ইরান ইস্যুতে ভারতের এই অবস্থান আগামী দিনে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং পশ্চিম এশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের সমীকরণে কী প্রভাব ফেলে, সেদিকেই এখন নজর আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলের।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

Recent Comments