Monday, April 20, 2026
HomeWorld Geopolitics & Military Affairsডলারের একাধিপত্যের শেষ অধ্যায়? ব্রিকসের বিকল্প অর্থব্যবস্থা ও বদলে যেতে থাকা বিশ্ব...

ডলারের একাধিপত্যের শেষ অধ্যায়? ব্রিকসের বিকল্প অর্থব্যবস্থা ও বদলে যেতে থাকা বিশ্ব শক্তির কাঠামো।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে উঠেছিল, তা আজ স্পষ্টভাবেই টালমাটাল। বহু বিশ্লেষকের মতে, এই ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি ছিল মার্কিন ডলারের আধিপত্য এবং তার সঙ্গে যুক্ত তথাকথিত ‘পেট্রোডলার’ ব্যবস্থা। তেল রপ্তানিকারক দেশগুলির আয় মার্কিন ট্রেজারি বন্ডে পুনঃবিনিয়োগের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব টিকিয়ে রাখা হতো। এই চক্রের বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করলেই সংশ্লিষ্ট দেশগুলির ওপর নিষেধাজ্ঞা, সম্পদ জব্দ বা আরও কঠোর চাপ নেমে আসত।

কিন্তু এখন সেই ব্যবস্থার ভিতরেই বড় ফাটল দেখা দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র একদিকে সামরিক আধিপত্য বজায় রাখতে বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করছে, অন্যদিকে একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার ক্ষমতা হারাতে বসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই দুই লক্ষ্য একসঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে পূরণ করা আর সম্ভব নয়। ইউক্রেন যুদ্ধ এই দ্বন্দ্বকে আরও স্পষ্ট করেছে। সামরিক খাতে ব্যয় বাড়াতে গিয়ে আর্থিক কাঠামোর উপর চাপ বেড়েছে, ফলে কিছু ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে গ্লোবাল সাউথ বা উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলির মধ্যে বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থার সন্ধান জোরদার হয়েছে। রাশিয়ার সম্পদ জব্দ এবং তাকে সুইফট পেমেন্ট সিস্টেম থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনা অনেক দেশের চোখ খুলে দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলি বুঝতে পারছে, ডলারের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ভবিষ্যতে বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই স্বর্ণ মজুত বাড়ানো, দ্বিপাক্ষিক মুদ্রায় বাণিজ্য এবং বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থার দিকে ঝোঁক স্পষ্ট হচ্ছে।

এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে ব্রিকস জোট। ব্রিকস নিজেকে এখনো সরাসরি বিদ্যমান ব্যবস্থার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে তুলে ধরছে না, কিন্তু একটি কার্যকর বিকল্প গড়ে তোলার চেষ্টা যে চলছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। লক্ষ্য একটাই—ডলার ছাড়াও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেন সম্ভব করা।

ভেনেজুয়েলা ও ইরানের অভিজ্ঞতা এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। ভেনেজুয়েলা দেখিয়েছে, ডলারের বাইরে তেল বেচে টিকে থাকা কতটা কঠিন। অন্যদিকে ইরান প্রমাণ করছে, চীনের সঙ্গে ইউয়ানে তেল বেচাকেনা করেও নিষেধাজ্ঞার মাঝখানে কিছুটা জায়গা তৈরি করা যায়। এই কারণেই অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ইরান আসলে ডলার-ব্যবস্থার বিকল্প পরীক্ষার আসল পরীক্ষাগার।

এই পটভূমিতে ব্রিকসের মধ্যে একাধিক বিকল্প পেমেন্ট ও সেটেলমেন্ট ব্যবস্থার পরীক্ষা চলছে। একটি ধারণা হলো ‘দ্য ইউনিট’—একটি অ-সার্বভৌম, ব্লকচেনভিত্তিক ট্রেড টোকেন, যা কোনো একক দেশের নিয়ন্ত্রণে থাকবে না। এটি মুদ্রা নয়, বরং একটি হিসাবের একক, যা পণ্য বা নিরপেক্ষ সূচকের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। অনেকটা আইএমএফ-এর স্পেশাল ড্রয়িং রাইটসের মতো, তবে ব্রিকস কাঠামোর মধ্যে।

আরেকটি উদ্যোগ হলো মাল্টি-সেন্ট্রাল ব্যাঙ্ক ডিজিটাল কারেন্সি প্ল্যাটফর্ম, যেখানে অংশগ্রহণকারী দেশগুলির কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক সরাসরি যুক্ত থাকবে। এর লক্ষ্য আন্তর্জাতিক লেনদেন দ্রুত ও নিরাপদ করা, ডলার বা সুইফটের প্রয়োজন কমানো। পাশাপাশি ব্রিকস পে নামে একটি পেমেন্ট সিস্টেম পরীক্ষামূলকভাবে চালু হয়েছে, যা পর্যটক ও ব্যবসায়ীদের জন্য সহজ ডিজিটাল পেমেন্টের সুযোগ দিতে পারে। তবে এখানে বড় সমস্যা হলো ভিসা ও মাস্টারকার্ডের মতো মার্কিন নিয়ন্ত্রিত নেটওয়ার্কের উপর নির্ভরতা।

সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হিসেবে অনেক বিশেষজ্ঞ চীনের সিআইপিএস ব্যবস্থার কথা বলছেন। এটি ইতিমধ্যেই বহু দেশে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং ইউয়ানভিত্তিক লেনদেন সহজ করছে। তবু ইউয়ানকে পুরোপুরি বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চীন নিজেই এখনো পুরোপুরি আগ্রহী নয়।

অন্য একটি প্রস্তাব আরও দূরদর্শী—নতুন আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, যা কেবল আন্তর্জাতিক লেনদেনের জন্য একটি নতুন মুদ্রা জারি করবে। এই মুদ্রা জাতীয় মুদ্রার বিকল্প হবে না, বরং তাদের পাশে সমান্তরালভাবে চলবে। জন মেনার্ড কেইনস একসময় যে ‘ব্যানকর’-এর কথা বলেছিলেন, ধারণাটি অনেকটা তারই আধুনিক রূপ।

এই সব উদ্যোগের পথ সহজ নয়। পশ্চিমা দেশগুলির চাপ, নিষেধাজ্ঞার হুমকি এবং রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা থাকবেই। তবু বাস্তবতা হলো, ডলারের অংশ এখন বৈশ্বিক রিজার্ভে ৪০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে, আর স্বর্ণের গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। অর্থাৎ পরিবর্তন ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে।

ভারতে আসন্ন ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন এই প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। প্রশ্ন একটাই—ব্রিকস কি কেবল আলোচনা আর পরীক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি সত্যিই এমন একটি বিকল্প কাঠামো দাঁড় করাতে পারবে, যা ভবিষ্যতের বিশ্ব অর্থনীতিতে ডলারের একচেটিয়া আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাবে? অনেকের মতে, সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। এই মুহূর্তে সিদ্ধান্ত না নিলে, আগামী দিনে সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।

সুত্র – ZeroHedge

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

Recent Comments