আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা সামনে এসেছে, যেখানে চীন জানিয়েছে যে তারা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদ পাওয়ার বিষয়ে ভারতের আকাঙ্ক্ষাকে “বোঝে এবং সম্মান করে”। সাম্প্রতিক এক বৈঠকে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব ও চীনের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে আলোচনার পর এই মন্তব্য সামনে আসে। বৈঠকটি দিল্লিতে অনুষ্ঠিত হয় এবং সেখানে সীমান্ত পরিস্থিতি, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়। সেই প্রেক্ষিতেই চীনের এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
ভারত বহুদিন ধরেই জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদের দাবিদার। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গণতন্ত্র, দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক শান্তিরক্ষায় বড় ভূমিকা থাকার কারণে নয়াদিল্লি মনে করে, বর্তমান নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামোতে ভারতের উপস্থিতি থাকা উচিত। বর্তমান কাঠামো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তৈরি হয়েছিল, যেখানে পাঁচটি দেশ স্থায়ী সদস্য এবং তাদের ভেটো ক্ষমতা রয়েছে। সেই সময়কার ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে আজকের বিশ্ব পরিস্থিতির বড় পার্থক্য থাকলেও পরিষদের কাঠামো প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। এ কারণেই সংস্কারের দাবি দীর্ঘদিন ধরে উঠছে।
চীনের এই নতুন মন্তব্যকে অনেকেই কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন। তবে এখানে একটি সূক্ষ্ম বিষয় রয়েছে। চীন সরাসরি ভারতের স্থায়ী সদস্যপদকে সমর্থন করছে এমন কোনো ঘোষণা দেয়নি। তারা শুধু বলেছে যে ভারতের আকাঙ্ক্ষাকে তারা সম্মান করে। আন্তর্জাতিক কূটনীতির ভাষায় এটি একটি মধ্যপন্থী অবস্থান। অর্থাৎ, চীন আপাতত সরাসরি বিরোধিতা করছে না, আবার সমর্থনও দিচ্ছে না।
এই অবস্থান পরিবর্তনের পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে ভারত ও চীনের মধ্যে সীমান্ত উত্তেজনা কিছুটা কমেছে এবং দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগ বেড়েছে। কাইলাশ-মানসসরোবর যাত্রা পুনরায় চালু হওয়া, বিমান পরিষেবা চুক্তি নিয়ে আলোচনা এবং মানুষে মানুষে যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ—এসব বিষয় দুই দেশের সম্পর্কের পরিবেশ কিছুটা নরম করেছে। একই সঙ্গে ব্রিকসের মতো বহুপাক্ষিক প্ল্যাটফর্মে দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করছে, যেখানে পশ্চিমা প্রভাবের বাইরে একটি বিকল্প অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামো গড়ার চেষ্টা চলছে। এই প্রেক্ষাপটে চীন ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি খারাপ রাখতে চাইছে না।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের প্রতিযোগিতা ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ভারতের গুরুত্ব বেড়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে চীন কূটনৈতিকভাবে এমন কোনো অবস্থান নিতে চাইছে না, যা ভারতকে পুরোপুরি পশ্চিমা ব্লকের দিকে ঠেলে দেয়। ফলে ভারতের কিছু বিষয়ে নমনীয় ভাষা ব্যবহার করা চীনের জন্য একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হতে পারে।
তবে ভারতের জন্য বাস্তবতা হলো, নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদ পাওয়া একটি জটিল প্রক্রিয়া। এর জন্য শুধু বর্তমান স্থায়ী সদস্যদের সম্মতি নয়, জাতিসংঘ সনদের সংশোধনও প্রয়োজন, যা বহু দেশের সমর্থন ছাড়া সম্ভব নয়। চীন অতীতে একাধিকবার পরোক্ষভাবে ভারতের দাবিকে বাধা দিয়েছে। তাই কেবল “সম্মান” শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে বাস্তব সমর্থন পাওয়া যাবে—এমনটা এখনই বলা যাচ্ছে না।
ভারত বারবার বলেছে যে নিরাপত্তা পরিষদের বর্তমান কাঠামো বিশ্বের বাস্তব প্রতিনিধিত্ব করে না। আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা এবং দক্ষিণ এশিয়ার মতো বিশাল অঞ্চল থেকে কোনো স্থায়ী সদস্য নেই। এই অবস্থায় পরিষদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া অনেক সময় বৈশ্বিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না। ভারতের মতে, পরিষদকে আরও প্রতিনিধিত্বমূলক এবং গণতান্ত্রিক করতে নতুন স্থায়ী সদস্য যুক্ত করা জরুরি।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য এবং রাশিয়া প্রকাশ্যে ভারতের স্থায়ী সদস্যপদের দাবিকে সমর্থন করেছে। যুক্তরাষ্ট্রও নীতিগতভাবে ভারতের পক্ষে কথা বলেছে, যদিও আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে খুব বেশি অগ্রগতি হয়নি। এই প্রেক্ষাপটে চীনের অবস্থানই ছিল সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তার কারণ।
বর্তমান পরিস্থিতিতে চীনের বক্তব্যকে একটি কূটনৈতিক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটি হয়তো দুই দেশের সম্পর্কের পরিবেশ উন্নত করার একটি প্রচেষ্টা, অথবা বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক সমীকরণের অংশ। তবে এটিকে ভারতের স্থায়ী সদস্যপদের নিশ্চিত সমর্থন হিসেবে দেখার মতো পর্যায় এখনো আসেনি।
ভারতও বিষয়টি নিয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। নয়াদিল্লি জানে যে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভাষার গুরুত্ব অনেক, কিন্তু বাস্তব পদক্ষেপই শেষ কথা। তাই চীনের বক্তব্যকে ইতিবাচক ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হলেও, তা কতটা বাস্তবে রূপ নেবে তা সময়ই বলবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার এবং ভারতের স্থায়ী সদস্যপদ প্রশ্নে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। চীনের সাম্প্রতিক মন্তব্য সেই আলোচনায় একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তবে এই পথ দীর্ঘ এবং জটিল। কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রেখে, বহুপাক্ষিক সমর্থন জোগাড় করেই ভারতকে এগোতে হবে। এখন দেখার বিষয়, চীনের এই নমনীয় ভাষা ভবিষ্যতে বাস্তব সমর্থনে পরিণত হয় কি না, নাকি এটি শুধুই কৌশলগত কূটনৈতিক বার্তা হয়ে থাকে।
