প্রতিরক্ষা উৎপাদন খাতে একটি বড় মাইলফলক। হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক্স লিমিটেড (HAL) এবং আমেরিকার জেনারেল ইলেকট্রিক (GE) এয়ারোস্পেসের মধ্যে জয়েন্ট ম্যানুফ্যাকচারিং অফ GE F414 ইঞ্জিন নিয়ে টেকনিক্যাল আলোচনা সম্পূর্ণ হয়েছে। ৮০ শতাংশ প্রযুক্তি হস্তান্তর (Technology Transfer) সহ মূল বিষয়গুলো চূড়ান্ত হয়েছে। বাণিজ্যিক আলোচনা এখনও চলছে এবং চলতি অর্থবছরের মধ্যেই চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। উৎপাদন শুরু হতে পারে প্রায় দু’বছরের মধ্যে।
ইকোনমিক টাইমসের (ET) সূত্র অনুসারে, এই চুক্তি সম্পন্ন হলে ভারতীয় বিমানবাহিনীর জন্য তেজস মার্ক-২ (LCA Mk-2) যুদ্ধবিমানের ইঞ্জিন দেশেই তৈরি হবে, যা ‘আত্মনির্ভর ভারত’ অভিযানের অন্যতম বড় সাফল্য হয়ে উঠবে।
HAL এবং GE-এর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলা আলোচনায় টেকনিক্যাল দিকগুলো চূড়ান্ত হয়েছে। এতে ৮০% প্রযুক্তি হস্তান্তর নিশ্চিত হয়েছে। অর্থাৎ, ইঞ্জিনের ডিজাইন, উৎপাদন প্রক্রিয়া, ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স, টেস্টিং এবং কোয়ালিটি কন্ট্রোলের বেশিরভাগ অংশ ভারতে স্থানান্তরিত হবে।
বাকি ২০% প্রযুক্তি যেমন কিছু ক্রিটিক্যাল কম্পোনেন্ট এবং অত্যাধুনিক সফটওয়্যার এখনও GE-এর নিয়ন্ত্রণে থাকবে। তবে HAL-এর ব্যাঙ্গালুরু এবং করাপুট ডিভিশনে অত্যাধুনিক উৎপাদন লাইন স্থাপন করা হবে।
GE F414 ইঞ্জিন তেজস মার্ক-২ যুদ্ধবিমানের জন্য নির্বাচিত হয়েছে। এই ইঞ্জিন প্রতি ইউনিটে ৯৮ কিলোনিউটন থ্রাস্ট প্রদান করবে, যা তেজস মার্ক-১এ-র GE F404 ইঞ্জিনের চেয়ে অনেক শক্তিশালী। এতে বিমানটি সুপারক্রুজ ক্ষমতা, উন্নত রেঞ্জ এবং ভারী অস্ত্র বহনের সক্ষমতা পাবে।
ভারতীয় বিমানবাহিনী তেজস মার্ক-২-এর অন্তত ৮৩টি (পরে আরও বেশি) উৎপাদনের পরিকল্পনা করেছে। দেশীয় উৎপাদন শুরু হলে আমদানি নির্ভরতা কমবে এবং খরচও অনেক কমে আসবে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, “এই চুক্তি শুধু একটি ইঞ্জিন উৎপাদন নয়, বরং ভারতকে জেট ইঞ্জিন প্রযুক্তির মানচিত্রে নিয়ে যাবে।” বর্তমানে জেট ইঞ্জিন তৈরির প্রযুক্তি খুব কম দেশেরই আয়ত্তে আছে। এই চুক্তির মাধ্যমে ভারত সেই ক্লাবের সদস্য হতে চলেছে।
HAL ইতিমধ্যেই GE-এর সঙ্গে যৌথভাবে ইঞ্জিনের কম্পোনেন্ট তৈরি শুরু করেছে। পরবর্তী ধাপে পুরো ইঞ্জিন অ্যাসেম্বলি, টেস্টিং এবং ওভারহলিংয়ের সক্ষমতা তৈরি হবে।
টেকনিক্যাল আলোচনা শেষ হলেও বাণিজ্যিক দিক — যেমন মূল্য, অফসেট পলিসি, রয়্যালটি এবং লোকাল কনটেন্টের শতাংশ নিয়ে আলোচনা এখনও চলছে। সরকার আশা করছে চলতি অর্থবছর (২০২৫-২৬) শেষ হওয়ার আগেই চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে।
উৎপাদন শুরু হতে দু’বছর সময় লাগবে। অর্থাৎ ২০২৮ সালের মাঝামাঝি থেকে প্রথম ইঞ্জিন রোল আউট শুরু হতে পারে। প্রথম পর্যায়ে বছরে ১০-১২টি ইঞ্জিন উৎপাদনের লক্ষ্য রাখা হয়েছে, যা পরে বাড়ানো হবে।
এই চুক্তি ভারত-মার্কিন প্রতিরক্ষা সম্পর্কের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। GE-এর সঙ্গে ৮০% টেকনোলজি ট্রান্সফার পাওয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটি বড় ছাড়। এর আগে F-414 ইঞ্জিনের জন্য ভারত দীর্ঘদিন ধরে দর কষাকষি করছিল।
এই সাফল্য AMCA (Advanced Medium Combat Aircraft) প্রকল্পের জন্যও পথ প্রশস্ত করবে। ভবিষ্যতে আরও উন্নত ইঞ্জিন (যেমন ১১০ কিলোনিউটন ক্লাস) তৈরির ক্ষেত্রে এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগবে।
এই প্রকল্পে হাজারের বেশি উচ্চ দক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি হবে। দেশীয় MSME সেক্টরও বড় সুবিধা পাবে কারণ ইঞ্জিনের অনেক কম্পোনেন্ট স্থানীয়ভাবে তৈরি করতে হবে। এটি ভারতকে জেট ইঞ্জিন রপ্তানিকারক দেশ হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করবে।
HAL-এর চেয়ারম্যান বলেছেন, “এই চুক্তি আমাদের ইঞ্জিন ম্যানুফ্যাকচারিং ক্ষমতাকে পরবর্তী স্তরে নিয়ে যাবে।”
যদিও চুক্তিটি আশাব্যঞ্জক, তবু কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রযুক্তি হস্তান্তরের মান নিশ্চিত করা, দক্ষ জনবল তৈরি, কোয়ালিটি কন্ট্রোল এবং সময়মতো উৎপাদন শুরু করা বড় কাজ। এছাড়া ভবিষ্যতে রক্ষণাবেক্ষণ ও আপগ্রেডেশনের জন্য GE-এর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।
HAL ও GE-এর এই চুক্তি ভারতের প্রতিরক্ষা স্বনির্ভরতার ইতিহাসে একটি সোনালি অধ্যায় যোগ করতে চলেছে। এটি শুধু তেজস মার্ক-২ প্রকল্পকে শক্তিশালী করবে না, বরং ভারতকে বিশ্বের বড় বিমান প্রস্তুতকারক দেশগুলোর কাতারে নিয়ে যাবে।
চলতি অর্থবছরে চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষর এবং দু’বছর পর উৎপাদন শুরু — এই দুটি ঘটনা ভারতের আকাশশক্তিকে নতুন মাত্রা দেবে। আত্মনির্ভর ভারতের স্বপ্ন এখন আর শুধু স্বপ্ন নয়, বাস্তবে রূপ নিতে চলেছে।
সূত্র – ইকোনমিক টাইমস
