Monday, April 20, 2026
HomeIndia Armed Forces & Internal Securityভারত–আমেরিকা প্রতিরক্ষা সম্পর্কে নতুন গতি: P-8I নজরদারি বিমান ও F414 ইঞ্জিন চুক্তি...

ভারত–আমেরিকা প্রতিরক্ষা সম্পর্কে নতুন গতি: P-8I নজরদারি বিমান ও F414 ইঞ্জিন চুক্তি এগোনোর পথে।

নয়াদিল্লি ও ওয়াশিংটনের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আবার গতি পাচ্ছে। সাম্প্রতিক বাণিজ্য সমঝোতা, শুল্ক হ্রাস এবং কূটনৈতিক উত্তেজনা প্রশমিত হওয়ার পর ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র পুরনো কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি প্রতিরক্ষা চুক্তিকে এগিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে। এই পরিবর্তিত পরিবেশে সবচেয়ে আগে যে দু’টি প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে, তা হল ভারতীয় নৌবাহিনীর জন্য অতিরিক্ত ছয়টি P-8I সামুদ্রিক নজরদারি ও সাবমেরিন-বিরোধী বিমান কেনা এবং ভারতে GE F414-INS6 জেট ইঞ্জিনের যৌথ উৎপাদন।

প্রতিরক্ষা সূত্র জানাচ্ছে, প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের সর্বোচ্চ ক্রয় সংস্থা প্রতিরক্ষা অধিগ্রহণ পরিষদের বৈঠকে চলতি মাসের তৃতীয় সপ্তাহেই এই বিষয়ে আলোচনা হবে। সব কিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে, নতুন অর্থবর্ষের শুরুতেই চুক্তি সই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কয়েক বছর ধরে নানা কারণে এই ফাইলগুলি আটকে ছিল, কিন্তু বর্তমান ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রেক্ষাপটে দুই দেশই প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে আবার অগ্রাধিকার দিতে চাইছে।

ভারতীয় নৌবাহিনীর ক্ষেত্রে P-8I বিমান একটি পরীক্ষিত ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। বর্তমানে নৌবাহিনী ইতিমধ্যেই ১২টি P-8I বিমান ব্যবহার করছে, যেগুলি দীর্ঘ পাল্লার সামুদ্রিক নজরদারি, সাবমেরিন শনাক্তকরণ ও শত্রু জাহাজ ট্র্যাকিংয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। আরও ছয়টি বিমান যুক্ত হলে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভারতের নজরদারি ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। বিশেষ করে চীনা নৌবাহিনীর ক্রমবর্ধমান উপস্থিতির প্রেক্ষিতে এই সক্ষমতা কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

এই ছয়টি বিমানের প্রস্তাব প্রথম অনুমোদন পেয়েছিল ২০১৯ সালে। তখনকার প্রতিরক্ষামন্ত্রী নৌবাহিনীর অনুরোধে মার্কিন সরকারের সঙ্গে সরকার-টু-সরকার বিদেশি সামরিক বিক্রয় পদ্ধতিতে এগোনোর সবুজ সংকেত দিয়েছিলেন। পরবর্তী ধাপে ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে চিঠি দেয় এবং ২০২১ সালের মে মাসে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট প্রায় ২.৪২ বিলিয়ন ডলারের এই চুক্তিতে অনুমোদন দেয়। তবুও উচ্চ খরচ এবং পরবর্তীকালে দুই দেশের রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে চুক্তি সই হয়নি।

তবে উত্তেজনার মধ্যেও প্রতিরক্ষা স্তরে আলোচনা বন্ধ ছিল না। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর ও Boeing-এর প্রতিনিধিরা ভারতে এসে বিস্তারিত আলোচনা করেন। সেই ধারাবাহিকতাতেই এবার বিষয়টি আবার আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের পথে এগোচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।

দ্বিতীয় বড় উদ্যোগটি হল ভারতে GE F414-INS6 ইঞ্জিনের যৌথ উৎপাদন। এই ইঞ্জিন ব্যবহার করা হবে ভারতের ভবিষ্যৎ যুদ্ধবিমান কর্মসূচির দুটি গুরুত্বপূর্ণ স্তরে। প্রথমত, তেজস মার্ক-২ এবং দ্বিতীয়ত, ভারতের পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান কর্মসূচি এএমসিএ-র প্রথম ধাপে। এই চুক্তির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হল প্রায় ৮০ শতাংশ প্রযুক্তি হস্তান্তর। যদিও প্রতিরক্ষা সূত্র স্পষ্ট করে জানাচ্ছে, এই প্রযুক্তি হস্তান্তর মূলত উৎপাদন সংক্রান্ত। ইঞ্জিনের নকশা ও মৌলিক ডিজাইন প্রযুক্তি এর আওতায় পড়ছে না।

ইঞ্জিনের পূর্ণাঙ্গ নকশা ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে ভারত একটি ভিন্ন পথ নিয়েছে। এএমসিএ-র দ্বিতীয় ধাপে ব্যবহৃত হওয়ার জন্য প্রায় ১২০ কিলোনিউটন থ্রাস্টের একটি সম্পূর্ণ নতুন ইঞ্জিন যৌথভাবে তৈরি করতে ফরাসি সংস্থা Safran-এর সঙ্গে অংশীদারিত্বে যাবে ভারত। সেই ইঞ্জিন ভবিষ্যতে সম্পূর্ণভাবে ভারতেই নকশা, উন্নয়ন ও উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে এগোনো হবে।

বর্তমানে HAL ইতিমধ্যেই দশটি F414 ইঞ্জিন কিনে রেখেছে, যা তেজস মার্ক-২ উৎপাদনের প্রাথমিক পরিকল্পনার অংশ ছিল। তবে নকশা ও সার্টিফিকেশন সংক্রান্ত কিছু জটিলতার কারণে সেই কর্মসূচি কিছুটা দেরিতে এগোচ্ছে। নতুন যৌথ উৎপাদন চুক্তি বাস্তবায়িত হলে এই জটিলতা অনেকটাই কাটবে বলে মনে করা হচ্ছে।

তেজস মার্ক-২ প্রকল্পটি ভারতের বিমান বাহিনীর আধুনিকীকরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটি হবে একটি উন্নত ৪.৫ প্রজন্মের এক ইঞ্জিনের বহুমুখী যুদ্ধবিমান, যা ধাপে ধাপে মিরাজ ২০০০, জাগুয়ার এবং মিগ-২৯ বহরের জায়গা নেবে। বড় ফিউজলাজ, কাছাকাছি বসানো ক্যানার্ড এবং আরও শক্তিশালী ইঞ্জিনের কারণে এই বিমান আগের তেজস সংস্করণগুলির তুলনায় অনেক বেশি সক্ষম হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩১–৩২ সাল নাগাদ এই বিমানের ধারাবাহিক উৎপাদন শুরু হওয়ার কথা।

ভারত–আমেরিকা প্রতিরক্ষা সম্পর্কের এই নতুন গতি শুধু অস্ত্র কেনাবেচার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৌশলগত বিশ্বাস, যৌথ উৎপাদন, শিল্প সহযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্ব। বিশেষ করে জেট ইঞ্জিনের মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রে উৎপাদন প্রযুক্তি ভাগাভাগি হওয়া ভারতের আত্মনির্ভর প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ার লক্ষ্যকে শক্তিশালী করবে।

সাম্প্রতিক বাণিজ্য সমঝোতা ও কূটনৈতিক বরফ গলার পর প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে এই অগ্রগতি দুই দেশের সম্পর্কের একটি নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ভারতীয় নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি এই চুক্তিগুলি আগামী দশকে ভারত–আমেরিকা কৌশলগত অংশীদারিত্বকে আরও গভীর করবে বলেই মনে করছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

Recent Comments