ভারতীয় সেনার জন্য আধুনিক স্বয়ংক্রিয় ড্রোন: শিল্ড এআই-এর সঙ্গে বড় চুক্তি, দেশে তৈরি হবে V-BAT ।
ভারতীয় সেনা তাদের নজরদারি ও গোয়েন্দা ক্ষমতা আরও শক্তিশালী করতে এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে, আর সেই বাস্তবতাকে মাথায় রেখেই ভারতীয় সেনা আমেরিকার প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি সংস্থা Shield AI-এর সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এই চুক্তির আওতায় ভারতীয় সেনার জন্য অত্যাধুনিক V-BAT উল্লম্ব উড্ডয়নক্ষম ড্রোন সংগ্রহ করা হবে, যা সম্পূর্ণভাবে ভারতে তৈরি হবে।
এই ড্রোনগুলি ভারতের মধ্যেই উৎপাদনের দায়িত্ব পেয়েছে JSW Defence। এর ফলে শুধু সেনাবাহিনীর আধুনিকীকরণই নয়, বরং প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে আত্মনির্ভরতার লক্ষ্যে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল ভারত। বিদেশি প্রযুক্তি থাকলেও উৎপাদন ও ভবিষ্যৎ উন্নয়নের বড় অংশ দেশেই হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে ভারতের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
V-BAT ড্রোনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর উল্লম্ব উড্ডয়ন ও অবতরণ ক্ষমতা। এই ড্রোন চালাতে কোনও রানওয়ে বা বিশেষ লঞ্চিং ব্যবস্থার প্রয়োজন হয় না। পাহাড়ি এলাকা, জঙ্গল, মরুভূমি বা দুর্গম সীমান্ত অঞ্চলে, যেখানে বড় বিমান বা প্রচলিত ড্রোন চালানো কঠিন, সেখানে এই ড্রোন সহজেই ব্যবহার করা যায়। ভারতের মতো বৈচিত্র্যময় ভৌগোলিক পরিস্থিতির দেশে এই ক্ষমতা সেনাবাহিনীর জন্য অত্যন্ত কার্যকর।
এই ড্রোন দীর্ঘ সময় আকাশে থাকতে পারে। একটানা বারো ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে উড়ে থেকে এটি নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের কাজ করতে সক্ষম। এর ফলে সীমান্ত এলাকায় বা সমুদ্র উপকূলে সেনাবাহিনী অনেক বেশি সময় ধরে নজরদারি চালাতে পারবে, যা আগের তুলনায় বড় সুবিধা এনে দেবে।
V-BAT ড্রোনে ব্যবহৃত হয়েছে শিল্ড এআই-এর উন্নত স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার ব্যবস্থা, যার নাম হাইভমাইন্ড। এই সফটওয়্যার ড্রোনটিকে নিজে নিজে পরিবেশ বুঝতে, সিদ্ধান্ত নিতে এবং মিশন সম্পন্ন করতে সাহায্য করে। যোগাযোগ ব্যবস্থা বা জিপিএস সংকেত বিঘ্নিত হলেও এই ড্রোন কার্যকরভাবে কাজ চালিয়ে যেতে পারে। আধুনিক যুদ্ধে যেখানে ইলেকট্রনিক জ্যামিং একটি বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে এই ধরনের স্বয়ংক্রিয় ক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন কেবল রিমোট কন্ট্রোলড যন্ত্র হিসেবেই থাকবে না, বরং অনেক ক্ষেত্রে নিজে নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ করবে। হাইভমাইন্ড সফটওয়্যার সেই দিকেই একটি বড় পদক্ষেপ। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ড্রোন শত্রু এলাকায় প্রবেশ করেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় নজরদারি চালাতে পারবে এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করতে সক্ষম হবে।
এই চুক্তির আওতায় শুধু ড্রোন সরবরাহই নয়, বরং সফটওয়্যারের লাইসেন্সও ভারতীয় অংশীদারদের দেওয়া হবে। এর ফলে ভবিষ্যতে ভারত নিজস্ব প্রয়োজন অনুযায়ী এই স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার উন্নয়ন ও পরিবর্তন করতে পারবে। এটি ভারতের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে স্বনির্ভরতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে একটি বড় সুযোগ।
শিল্ড এআই-এর ভারতীয় কার্যক্রমের দায়িত্বে থাকা সংস্থার প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, ভারতের ভূপ্রকৃতি ও কৌশলগত চাহিদার কথা মাথায় রেখেই এই ড্রোনকে উপযুক্ত মনে করা হয়েছে। হিমালয়ের উচ্চ পার্বত্য অঞ্চল থেকে শুরু করে বিস্তীর্ণ সমুদ্র উপকূল পর্যন্ত, বিভিন্ন ধরনের অভিযানে এই ড্রোন ব্যবহার করা যাবে।
ভারতে উৎপাদনের জন্য জেএসডব্লিউ ডিফেন্স ইতিমধ্যেই হায়দরাবাদের মাহেশ্বরম এলাকায় একটি আধুনিক কারখানা নির্মাণ শুরু করেছে। এই প্রকল্পে প্রায় নব্বই মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হচ্ছে। এই কারখানা শুধু ভারতীয় সেনার চাহিদা পূরণ করবে না, বরং ভবিষ্যতে এটিকে একটি আন্তর্জাতিক উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে। এর ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং দেশের প্রতিরক্ষা শিল্প আরও শক্তিশালী হবে।
শিল্ড এআই-এর ড্রোন ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক স্তরে নিজেদের কার্যকারিতা প্রমাণ করেছে। ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে এই ড্রোনগুলি ব্যবহার করে কঠিন ইলেকট্রনিক জ্যামিংয়ের মধ্যেও গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। এই অভিজ্ঞতা থেকেই সংস্থাটি তাদের স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তিকে আরও উন্নত করেছে, যা এখন ভারতের সেনাবাহিনীর হাতেও আসছে।
ভারতীয় সেনার এই সিদ্ধান্ত কেবল একটি প্রযুক্তি কেনার বিষয় নয়, বরং এটি ভবিষ্যতের যুদ্ধের প্রস্তুতির অংশ। ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা আগামী দিনে যুদ্ধের ধরন বদলে দেবে। এই চুক্তির মাধ্যমে ভারত সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের উদ্যোগ ভারতের প্রতিরক্ষা কৌশলে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। আগে যেখানে বিদেশি সরঞ্জাম কিনে ব্যবহার করা হতো, এখন সেখানে প্রযুক্তি স্থানান্তর, দেশীয় উৎপাদন এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে খরচ কমবে, রক্ষণাবেক্ষণ সহজ হবে এবং জরুরি পরিস্থিতিতে বিদেশি সরবরাহের ওপর নির্ভরতা কমবে।
সব মিলিয়ে, শিল্ড এআই-এর সঙ্গে ভারতীয় সেনার এই চুক্তি আধুনিক যুদ্ধের বাস্তবতাকে স্বীকার করে নেওয়ার একটি বড় উদাহরণ। উল্লম্ব উড্ডয়নক্ষম, দীর্ঘ সময় আকাশে থাকতে সক্ষম এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করতে পারা এই ড্রোনগুলি আগামী দিনে ভারতের সীমান্ত সুরক্ষা ও গোয়েন্দা ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। একই সঙ্গে, দেশে উৎপাদনের মাধ্যমে এই প্রকল্প ‘আত্মনির্ভর ভারত’ উদ্যোগকে আরও শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করিয়ে দিল।
