Monday, April 20, 2026
HomeIndia Defence Technology & Industry ভারতের নৌশক্তির নতুন অধ্যায়: প্রকল্প ৭৫আই-এর অধীনে ৯৯,০০০ কোটি টাকার জার্মান এআইপি...

 ভারতের নৌশক্তির নতুন অধ্যায়: প্রকল্প ৭৫আই-এর অধীনে ৯৯,০০০ কোটি টাকার জার্মান এআইপি সাবমেরিন চুক্তি।

ভারতীয় নৌবাহিনী একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েছে। ২০২৬ সালের মার্চ মাসে প্রকাশিত খবর অনুসারে, ভারত জার্মানির থাইসেনক্রুপ মেরিন সিস্টেমস (টিকেএমএস)-এর ছয়টি উন্নত এয়ার ইন্ডিপেন্ডেন্ট প্রপালশন (এআইপি) সাবমেরিন কেনার চুক্তি চূড়ান্ত করতে চলেছে। এই চুক্তির মূল্য প্রায় ৯৯,০০০ কোটি টাকা, যা ভারতের সামরিক ইতিহাসে সবচেয়ে বড় একটি চুক্তি হিসেবে চিহ্নিত হবে। এই সাবমেরিনগুলো মুম্বাইয়ের মাজাগাঁও ডক শিপবিল্ডার্স লিমিটেড (এমডিএল)-এ নির্মিত হবে, যা ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ নীতির একটি বড় উদাহরণ। এই চুক্তি ভারতের সমুদ্রসীমা রক্ষা, চীন এবং পাকিস্তানের মতো প্রতিবেশী দেশের সাথে ভারসাম্য রক্ষা এবং নৌবাহিনীর আধুনিকীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

ভারতের সাবমেরিন প্রোগ্রামের ঐতিহাসিক পটভূমি বোঝার জন্য আমাদের ১৯৯০-এর দশকে ফিরে যেতে হবে। ১৯৮০-৯০-এর দশকে ভারত জার্মানির এইচডিডব্লিউ (হাউল্ডসওয়ার্ক ডয়চে ওয়েরফট) থেকে চারটি সাবমেরিন কিনেছিল, যা শান্ডার ক্লাস নামে পরিচিত। এই সাবমেরিনগুলো এখনও সেবায় রয়েছে এবং তাদের কার্যকারিতা প্রমাণিত। কিন্তু ভারতের সাবমেরিন ফ্লিট ধীরে ধীরে পুরনো হয়ে যাচ্ছিল। ২০১৪ সালে প্রকল্প ৭৫আই (পি-৭৫আই) অনুমোদিত হয়, যার উদ্দেশ্য ছিল ছয়টি উন্নত কনভেনশনাল (ডিজেল-ইলেকট্রিক) সাবমেরিন কেনা এবং নির্মাণ করা, যাতে এআইপি প্রযুক্তি থাকবে। এআইপি (এয়ার ইন্ডিপেন্ডেন্ট প্রপালশন) একটি প্রযুক্তি যা সাবমেরিনকে ডিজেল ইঞ্জিন ছাড়াই দীর্ঘ সময় ডুবে থাকতে সাহায্য করে। সাধারণ ডিজেল-ইলেকট্রিক সাবমেরিনকে প্রতি কয়েক দিনে সারফেস করে বাতাস নিতে হয়, কিন্তু এআইপি-যুক্ত সাবমেরিন তিন সপ্তাহ পর্যন্ত ডুবে থাকতে পারে, যা স্টিলথ এবং এন্ডুরেন্স বাড়ায়। এই প্রকল্পে প্রথমে ফ্রান্সের স্করপিন ক্লাসের অতিরিক্ত তিনটি সাবমেরিনের কথা ছিল, কিন্তু পরে জার্মানির টাইপ-২১৪ নেক্সট জেনারেশন (এনজি) ডিজাইন নির্বাচিত হয়েছে।

প্রকল্প ৭৫আই-এর গুরুত্ব অপরিসীম। ভারত মহাসাগর অঞ্চলে চীনের নৌশক্তি দ্রুত বাড়ছে। চীনের টাইপ-০৩৯ এবং টাইপ-০৪১ সাবমেরিনগুলো এআইপি-যুক্ত, যা ভারতের জন্য হুমকি। পাকিস্তানও চীনের সাহায্যে সাবমেরিন ফ্লিট বাড়াচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে ভারতের সাবমেরিন ফ্লিটকে আধুনিক করা জরুরি। বর্তমানে ভারতের কাছে রাশিয়ান কিলো-ক্লাস এবং ফ্রেঞ্চ স্করপিন ক্লাস সাবমেরিন রয়েছে, কিন্তু এআইপি-যুক্ত কোনোটিই নেই। এই চুক্তি ভারতকে প্রথমবার এআইপি প্রযুক্তি দেবে, যা সাবমেরিনের স্টিলথ ক্ষমতা বাড়াবে এবং ডিটেকশনের ঝুঁকি কমাবে। এছাড়া চুক্তিতে টেকনোলজি ট্রান্সফার (টুটি) রয়েছে, যা ভারতের স্থানীয় শিল্পকে মজবুত করবে। এমডিএল-এ নির্মাণ হওয়ায় ৪৫-৬০% ইন্ডিজেনাইজেশন হবে, যা হাজার হাজার চাকরি সৃষ্টি করবে এবং এমএসএমই সেক্টরকে উন্নত করবে।

চুক্তির বিবরণ অনুসারে, ছয়টি সাবমেরিন টিকেএমএস-এর টাইপ-২১৪এনজি ডিজাইনের উপর ভিত্তি করে তৈরি হবে। এতে ফুয়েল-সেল ভিত্তিক এআইপি সিস্টেম থাকবে, যা সাবমেরিনকে দীর্ঘ সময় ডুবে থাকতে সাহায্য করবে। চুক্তিতে ইনফ্রাস্ট্রাকচার, ট্রেনিং এবং লাইফসাইকেল সাপোর্ট অন্তর্ভুক্ত, কিন্তু বিশেষ অস্ত্রশস্ত্র নয়। প্রাথমিকভাবে চুক্তির মূল্য ৭০,০০০-৭২,০০০ কোটি টাকা অনুমান করা হয়েছিল, কিন্তু পরে এটি ৯৯,০০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা অতিরিক্ত খরচ (ইনফ্রাস্ট্রাকচার, ট্রেনিং) এর কারণে। ডিফেন্স অ্যাকুইজিশন কাউন্সিল (ডিএসি) চেয়ারম্যান রাজনাথ সিং-এর নেতৃত্বে অনুমোদন দিয়েছে। এখন ক্যাবিনেট কমিটি অন সিকিউরিটি (সিসিএস)-এর অনুমোদনের অপেক্ষা, যার পর ফাইন্যান্স মিনিস্ট্রি এবং ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সাথে আলোচনা হবে। চুক্তি এই আর্থিক বছরের শেষে (৩১ মার্চ, ২০২৬) স্বাক্ষরিত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু কিছু বিলম্বের কারণে পরবর্তী আর্থিক বছরের শুরুতে হতে পারে।

এআইপি প্রযুক্তির বিজ্ঞান বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ সাবমেরিন ডিজেল ইঞ্জিন চালাতে বাতাস দরকার, যা সারফেস করতে হয়। এতে ডিটেকশনের ঝুঁকি বাড়ে। এআইপি সিস্টেম (যেমন ফুয়েল-সেল) অক্সিজেন এবং হাইড্রোজেন থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে, যা বাতাস ছাড়াই প্রপালশন দেয়। জার্মানির টাইপ-২১৪-এ এই প্রযুক্তি প্রমাণিত, যা গ্রিস, তুরস্ক এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় সফলভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। ভারতের জন্য এটি গেম-চেঞ্জার, কারণ এতে সাবমেরিনের এন্ডুরেন্স বাড়বে এবং ভারত মহাসাগরে চীনের সাবমেরিনের বিরুদ্ধে সুবিধা পাবে।

প্রতিযোগিতার দিক থেকে, নৌবাহিনী জার্মান এবং স্প্যানিশ (নাভান্তিয়া) অপশনের মধ্যে চয়েস করেছে। লারসেন অ্যান্ড টুব্রো-নাভান্তিয়া জুটি ডিসকোয়ালিফাইড হয়েছে। ফ্রান্সের স্করপিনের অতিরিক্ত তিনটির প্রস্তাবও বাতিল হয়েছে। জার্মানির পূর্ব অভিজ্ঞতা (১৯৮০-৯০-এর এইচডিডব্লিউ) এবং টেকনোলজি ট্রান্সফারের প্রতিশ্রুতি এটিকে পছন্দ করেছে।

এই চুক্তির প্রভাব বিস্তৃত। নৌবাহিনীর আন্ডারওয়াটার ক্যাপাবিলিটি বাড়বে, যা ইন্ডিয়ান ওশান রিজিয়নে ভারতের প্রভাব বাড়াবে। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ এবং পাকিস্তানের সাথে গ্যাবালি পোর্টের মতো প্রকল্পের বিরুদ্ধে এটি কাউন্টার। ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ নীতি মজবুত হবে, কারণ স্থানীয় নির্মাণ এবং টুটি ভারতকে ভবিষ্যতে নিজস্ব সাবমেরিন ডিজাইন করতে সাহায্য করবে। অর্থনৈতিকভাবে, হাজার হাজার চাকরি সৃষ্টি হবে এবং ডিফেন্স এক্সপোর্টের সম্ভাবনা বাড়বে।

তবে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। চুক্তির খরচ বেড়েছে, যা বাজেটে চাপ ফেলবে। টেকনোলজি ট্রান্সফারের পরিমাণ এবং সময়সীমা নিশ্চিত করতে হবে। ভারতের নিউক্লিয়ার সাবমেরিন প্রোগ্রাম (এসএসবিএন এবং এসএসএন) চালিয়ে যেতে হবে, কারণ কনভেনশনাল সাবমেরিনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

Recent Comments