ইতিহাস বলে, যে জাতি সমুদ্র নিয়ন্ত্রণ করেছে, সে জাতি শেষ পর্যন্ত বিশ্ব-রাজনীতির কেন্দ্রে থেকেছে। ব্রিটেন তার সাম্রাজ্য গড়েছিল সমুদ্রপথ দখল করে। আমেরিকা আজও তার প্রভাব বজায় রাখে নৌশক্তির জোরে। আর চীন গত দুই দশক ধরে ভারত মহাসাগরে একের পর এক বন্দর নির্মাণ ও বিনিয়োগের মাধ্যমে যে “মুক্তার মালা” গেঁথেছে, সেটাও সেই একই কৌশলের অংশ। এই প্রেক্ষাপটে ভারতের মাজাগন ডকের কলম্বো ডকইয়ার্ডে ৫১ শতাংশ মালিকানা অধিগ্রহণকে শুধু একটি বাণিজ্যিক চুক্তি বলে পড়লে পুরো ছবিটা মিস হয়ে যাবে।
মাত্র ২৪৯.৫ কোটি রুপি। সংখ্যাটা শুনতে বড় মনে হলেও ভারতের প্রতিরক্ষা বা অবকাঠামো বাজেটের তুলনায় এটা অত্যন্ত ছোট। কিন্তু এই অর্থে যা কেনা হলো, তার ভৌগোলিক ও কৌশলগত মূল্য কোনো সংখ্যায় পুরোপুরি ধরা যায় না। কলম্বো ডকইয়ার্ড শ্রীলঙ্কার প্রধান জাহাজ মেরামতি ও রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র। এটি অবস্থিত সেই জায়গায়, যেখান দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের মোট সামুদ্রিক বাণিজ্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ চলাচল করে। কলম্বো বন্দর আন্তর্জাতিক ট্রান্সশিপমেন্টের একটি মূল কেন্দ্র। সেখানে ভারতের নিয়ন্ত্রণকারী অংশীদারিত্ব মানে শুধু জাহাজ সারানোর ব্যবসা নয়, এর অর্থ হলো ভারত মহাসাগরের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিন্দুতে ভারতের সক্রিয় উপস্থিতি।
এখানে একটা বিষয় লক্ষ্য করা যায়, কৌশলগত বিনিয়োগের সৌন্দর্য হলো এটি একসঙ্গে একাধিক লক্ষ্য পূরণ করে। বাণিজ্যিকভাবে, কলম্বো ডকইয়ার্ড এখন ক্ষতিতে চলছে। মাজাগন ডকের মতো একটি দক্ষ, অভিজ্ঞ সংস্থার হাতে এলে এটি ঘুরে দাঁড়াতে পারে। তাহলে ভারত ভর্তুকি দিতে থাকবে না, বরং সময়ের সঙ্গে বাণিজ্যিক মুনাফাও আসবে। একই সঙ্গে কৌশলগত দিক থেকে ভারতের নৌবাহিনী এবং বাণিজ্যিক জাহাজগুলো কলম্বোতে সেবা পাবে নিজেদের নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে। এটা লজিস্টিক স্বনির্ভরতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
সহজভাবে বললে, এই অধিগ্রহণ শ্রীলঙ্কার জন্যও মন্দ নয়। একটি লোকসানি সম্পদকে লাভজনক করার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, শ্রীলঙ্কার বন্দর অবকাঠামোয় বিনিয়োগ আসছে, এবং দুই প্রতিবেশীর মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর হচ্ছে। ভারত-শ্রীলঙ্কা সম্পর্কের ইতিহাসে টানাপড়েন কম ছিল না। কিন্তু বিনিয়োগ ও পারস্পরিক নির্ভরশীলতার মাধ্যমে সম্পর্ক গড়া — এই পথে ভারত এখন আরও সচেতনভাবে হাঁটছে।
তবে এই একটি বিনিয়োগকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে পুরো চিত্র অধরাই থেকে যাবে। গত কয়েক বছরে ভারত ভারত মহাসাগর অঞ্চলে যে পদক্ষেপগুলো নিয়েছে, সেগুলো একসঙ্গে দেখলে একটি সুসংগত কৌশলের রূপরেখা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের অবকাঠামো উন্নয়নে ভারত বিশেষ মনোযোগ দিচ্ছে। নিকোবরের ভৌগোলিক অবস্থান এমন যে সেখান থেকে মালাক্কা প্রণালীর প্রবেশপথ নজরে রাখা সম্ভব। মালাক্কা দিয়ে বিশ্বের সামুদ্রিক বাণিজ্যের বিশাল একটি অংশ যায়, বিশেষ করে চীনের জ্বালানি আমদানির একটি বড় অংশ এই পথেই চলে। নিকোবরে ভারতের সামরিক ও পর্যবেক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানো মানে এই গুরুত্বপূর্ণ পথের ওপর ভারতের দৃষ্টি আরও তীক্ষ্ণ হওয়া।
তামিলনাড়ুর বিঝিনজাম বন্দর একটি ভিন্ন মাত্রা যোগ করছে। গভীর সমুদ্রবন্দর হিসেবে বিঝিনজাম ভারতকে ট্রান্সশিপমেন্ট বাণিজ্যে সরাসরি প্রতিযোগী করে তুলছে। এখন পর্যন্ত ভারতের অনেক কার্গো কলম্বো বা সিঙ্গাপুর হয়ে ট্রান্সশিপ হতো, কারণ ভারতীয় বন্দরগুলো গভীরতায় বা সক্ষমতায় পিছিয়ে ছিল। বিঝিনজাম সেই ফাঁকটা পূরণ করতে পারে। এবং কলম্বো ডকইয়ার্ডের মালিকানা যদি ভারতের হয়, তাহলে বিঝিনজাম ও কলম্বো মিলে একটি পরিপূরক ট্রান্সশিপমেন্ট অক্ষ তৈরি হয় — যেটা এই অঞ্চলের সামুদ্রিক অর্থনীতিতে ভারতের অবস্থানকে মৌলিকভাবে বদলে দিতে পারে।
কোচি ইতিমধ্যে ভারতের নৌবাণিজ্যিক এবং শিল্পগত কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। মাজাগন ডক, যেটি ভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা জাহাজ নির্মাণ সংস্থা, সেটিই কলম্বো ডকইয়ার্ড অধিগ্রহণ করেছে। এটা কাকতালীয় নয়। ভারত চাইছে তার দেশীয় নৌ-শিল্প সক্ষমতার সঙ্গে আঞ্চলিক উপস্থিতি যুক্ত করতে। দেশে তৈরি করো, আঞ্চলিকভাবে মেরামত করো, সমুদ্রে সার্বক্ষণিক সক্রিয় থাকো — এই শৃঙ্খলটা তৈরি হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে চীনের কৌশলের কথা না বললে আলোচনা অসম্পূর্ণ থাকে। চীন গত দুই দশক ধরে ভারত মহাসাগর অঞ্চলে বিনিয়োগ করে আসছে — পাকিস্তানের গওয়াদার, শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা, মালদ্বীপে অবকাঠামো, মিয়ানমারের কাইয়ুকপিউ গভীর সমুদ্রবন্দর। এই বিনিয়োগগুলো বাণিজ্যিকভাবে সবসময় লাভজনক না হলেও কৌশলগতভাবে চীনকে একটার পর একটা ঘাঁটি দিয়েছে ভারতের চারদিকে। ভারত দীর্ঘদিন এই কৌশলের মুখোমুখি মূলত প্রতিক্রিয়াশীলভাবে দাঁড়িয়েছে। এবার মনে হচ্ছে ভারত সক্রিয় হচ্ছে।
কলম্বো ডকইয়ার্ডের অধিগ্রহণ চীনকে একটি স্পষ্ট বার্তা দেয় — শ্রীলঙ্কার কৌশলগত অবকাঠামোয় চীনের একাধিপত্যের জায়গা সংকুচিত হচ্ছে। হাম্বানটোটা বন্দর ৯৯ বছরের লিজে চীনের হাতে যাওয়ার পর যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল, কলম্বো ডকইয়ার্ডে ভারতের উপস্থিতি সেই সমীকরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য আনে। শ্রীলঙ্কার মতো একটি দ্বীপরাষ্ট্র, যেটি ভূকৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে একমাত্র বাইরের শক্তির প্রভাব না থেকে ভারতের সক্রিয় অংশীদারিত্ব থাকাটা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্যও ইতিবাচক।
তবে এই কৌশলের সাফল্য নির্ভর করবে এটা কতটা টেকসই ও সুষম হয় তার ওপর। শুধু কৌশলগত উপস্থিতি নিশ্চিত করলেই হবে না, প্রতিবেশীদের কাছে ভারতকে একজন নির্ভরযোগ্য, পারস্পরিক সুবিধাজনক অংশীদার হিসেবে প্রমাণ করতে হবে। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের সমালোচনা হয়েছে মূলত এই কারণে যে সেটি অনেক ক্ষেত্রে ঋণের ফাঁদে ফেলে স্বায়ত্তশাসনের বদলে নির্ভরশীলতা তৈরি করেছে। ভারতকে নিশ্চিত করতে হবে যে তার বিনিয়োগ এবং অংশীদারিত্ব সত্যিকারের পারস্পরিক সুবিধার ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে আছে।
ভারত মহাসাগর ভারতের নাম বহন করে — এটা একটি ভৌগোলিক সত্য। কিন্তু নামে থাকা আর নিয়ন্ত্রণে থাকা এক কথা নয়। দশকের পর দশক ধরে ভারত এই সমুদ্রে তার স্বাভাবিক প্রভাবকে পুরোপুরি কাজে লাগায়নি। এখন যা দেখা যাচ্ছে, সেটা সেই দীর্ঘ নিষ্ক্রিয়তার অবসানের ইঙ্গিত।
নিকোবরের চোখ থেকে বিঝিনজামের বন্দর, কলম্বোর ডক থেকে কোচির শিল্পকেন্দ্র — এই বিন্দুগুলো একটি চাপের মতো, একটি চাপ যা ভারত মহাসাগরকে ঘিরে ধরছে। এটা কোনো আগ্রাসী বিস্তার নয়। এটা একটি সভ্য, বহুমাত্রিক কৌশল — যেখানে বাণিজ্য, নিরাপত্তা এবং কূটনীতি একই সুতোয় গাঁথা।
যে জাতি সমুদ্রের নিয়ম লেখে, সে জাতি বাণিজ্যের নিয়মও লেখে, নিরাপত্তার নিয়মও লেখে। ভারত সেই লেখার কাজটি শুরু করেছে — শান্তভাবে, কিন্তু সুদৃঢ়ভাবে। এই নীরব কৌশলের শব্দ একদিন অনেক জোরে শোনা যাবে।
লেখক – দীপংকর সাহা
