স্ট্রেইট অব হরমুজে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ এবং ইরান-মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা যখন বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহকে অনিশ্চিত করে তুলেছে, ঠিক তখনই ওয়াশিংটন একটি বাস্তববাদী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মার্কিন ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট রাশিয়ান তেলের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার ওয়েভার (ছাড়) আরও ৩০ দিনের জন্য বাড়িয়েছে। এর ফলে ভারতসহ একাধিক দেশ রাশিয়া থেকে ডিসকাউন্টে তেল আমদানি অব্যাহত রাখতে পারবে। যে ওয়েভারটির মেয়াদ আজ শেষ হওয়ার কথা ছিল, তা বাড়ানোয় ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তায় বড় স্বস্তি এসেছে।
এই সিদ্ধান্ত স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, হরমুজ প্রণালীতে চলমান সংকট যতদিন থাকবে, ততদিন যুক্তরাষ্ট্রকেও বাস্তবতা মেনে চলতে হবে। আন্তর্জাতিক তেলের দাম আরও বৃদ্ধি রোধ করতে এবং বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনকে কিছুটা স্থিতিশীল রাখতে এই ছাড় বাড়ানো হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ভারত বর্তমানে রাশিয়া থেকে সবচেয়ে বেশি ক্রুড অয়েল আমদানি করে। ডিসকাউন্ট মূল্যে পাওয়া এই তেল দেশের পরিশোধনাগারগুলোর জন্য অত্যন্ত লাভজনক। পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয় সূত্রে জানানো হয়েছে, জ্বালানি নিরাপত্তা ও জাতীয় স্বার্থের কথা মাথায় রেখে ভারত রুশ তেল আমদানি চালিয়ে যাবে।
হরমুজ অবরোধের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহে বড় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে আমেরিকান নৌবাহিনী ইরানি বন্দরে যাওয়া-আসা জাহাজ আটকে দিয়েছে। এতে চীন, ভারতসহ এশিয়ার দেশগুলোর জ্বালানি আমদানি চাপে পড়েছে। ঠিক এই পরিস্থিতিতে রুশ তেলের ওয়েভার বাড়ানো ভারতের জন্য একটি অপ্রত্যাশিত স্বস্তি। ভারত রাশিয়া থেকে যে পরিমাণ তেল আমদানি করে, তা দেশের মোট আমদানির একটি বড় অংশ। এই ছাড় না থাকলে আমদানি খরচ বেড়ে যেত এবং অভ্যন্তরীণ জ্বালানির দামে চাপ পড়ত।
এই সিদ্ধান্ত ভারতের কৌশলগত স্বাধীনতারও স্বীকৃতি। যুক্তরাষ্ট্র চায় ভারত পুরোপুরি তার ছাতার নীচে চলে আসুক। কিন্তু ভারত রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে, চীনের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সমঝোতা করে এবং আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্যিক সহযোগিতা বাড়িয়ে নিজস্ব পথে চলছে। ওয়াশিংটনের এই ওয়েভার বাড়ানো দেখিয়ে দিচ্ছে যে, বাস্তবতা মেনে নিতে আমেরিকাকেও বাধ্য হতে হচ্ছে।
চলতি অর্থবছরে ভারতের মোট রপ্তানি (পণ্য ও সেবা) রেকর্ড $৮৬০ বিলিয়নে পৌঁছেছে। পণ্য রপ্তানি $৪৪১ বিলিয়ন এবং সেবা রপ্তানি $৪০০ বিলিয়নের ওপরে উঠেছে। ইলেকট্রনিক্স খাতে চীনের ওপর নির্ভরতা কমছে। চীনেই ইলেকট্রনিক কম্পোনেন্ট রপ্তানি $৩.৫ বিলিয়নে পৌঁছেছে। প্রতিরক্ষা রপ্তানি ৬২ শতাংশ বেড়ে $৪.১ বিলিয়ন হয়েছে। ৮০টিরও বেশি দেশে ভারতীয় প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম যাচ্ছে। আরব দেশগুলোতে খাদ্য রপ্তানিতে ভারত ব্রাজিলকে টপকে শীর্ষে উঠেছে। মার্চ মাসে বাণিজ্য ঘাটতি কমে $২০.৬৭ বিলিয়ন হয়েছে।
এই সাফল্যের মধ্যেও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আমদানি বেড়ে $৯৮০ বিলিয়ন হয়েছে। বাণিজ্য ঘাটতি $১১৯ বিলিয়ন। সোনা-রুপা, যন্ত্রপাতি এবং তেলের আমদানি বৃদ্ধি এর কারণ। হরমুজ অবরোধের ফলে ফ্রেইট ও ইনস্যুরেন্স খরচ বেড়েছে। চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি এখনও উদ্বেগজনক।
নেপালের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা ভারতের কূটনৈতিক কৌশলের অংশ। প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহের সফরে নতুন প্রকল্প, এমওইউ এবং আরোগ্য বাটিকার মতো উদ্যোগ আসছে। স্বাস্থ্য, আয়ুষ এবং বাণিজ্যে সহযোগিতা বাড়বে।
প্রতিরক্ষা খাতে আইএনএস আরিধামনের মতো পারমাণবিক সাবমেরিন সাফল্য এসেছে। রাশিয়ার সহযোগিতা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রচলিত সাবমেরিন নির্মাণে স্থবিরতা কাটাতে আরও প্রচেষ্টা দরকার।
নতুন গ্রেট গেমে আমেরিকা নিজেকে তেলের সুইং প্রডিউসার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে। কানাডা, ব্রাজিল ও ভেনেজুয়েলাকে নিয়ে নতুন চেইন গড়ছে। সৌদিকে পাশে রেখে চীনকে চাপে ফেলতে চাইছে। কিন্তু ভারত এই খেলায় পুরোপুরি ঢোকেনি। নিজের স্বার্থ অনুসারে রাশিয়ার তেল কিনছে, চীনের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়াচ্ছে এবং আমেরিকার সঙ্গেও সম্পর্ক উন্নয়ন করছে। এই বহুমুখী কূটনীতি ওয়াশিংটনকে অস্বস্তিতে ফেলেছে।
ডি-ডলারাইজেশন ধীরে চলছে। ডলারের আধিপত্য কমলেও বিকল্প এখনও পুরোপুরি তৈরি হয়নি। ভারত এই সুযোগে নিজস্ব মুদ্রায় লেনদেন বাড়াচ্ছে।
ইরানের অবস্থা সঙ্কটাপন্ন। তেল রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অর্থনীতি ধুঁকছে। যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ তাদের শেষ তাসও খসিয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে ভারত সংকটকে সুযোগে পরিণত করছে। রেকর্ড রপ্তানি, প্রতিরক্ষা খাতের উত্থান এবং আরব দেশগুলোতে খাদ্য রপ্তানির সাফল্য তার প্রমাণ।
ভারত সরকার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। জ্বালানি সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় তেল উৎপাদন বাড়ানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং সরবরাহ বৈচিত্র্যকরণ জরুরি।
ওয়াশিংটন যতই চাপ দিক, ভারত তার সার্বভৌমত্ব বজায় রাখবে। আমরা কোনো ব্লকের প্যান হব না। রাশিয়া, চীন, আমেরিকা — সবার সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিজের স্বার্থ রক্ষা করব। এটিই ভারতের কূটনীতির মূলমন্ত্র।
হরমুজের সংকট যতদিন চলবে, ততদিন এ ধরনের ছাড় বাড়তে পারে। কিন্তু ভারত-রাশিয়া জ্বালানি সম্পর্ক আরও মজবুত হচ্ছে। এই সংকট ভারতকে দেখিয়ে দিয়েছে যে, স্বাধীনতা বজায় রেখে কীভাবে সংকট মোকাবিলা করতে হয়।
ভারতের এই অবস্থান ইতিহাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আমরা কখনো কারও সামনে মাথা নত করিনি। এখনও করব না। হরমুজ অবরোধ, তেলের দাম বৃদ্ধি বা আন্তর্জাতিক চাপ — কিছুই ভারতের যাত্রা থামাতে পারবে না।
রেকর্ড রপ্তানি, প্রতিরক্ষা স্বনির্ভরতা এবং বহুমুখী কূটনীতি — এগুলোই ভারতের শক্তি। নতুন গ্রেট গেমে ভারত শুধু টিকে থাকবে না, নেতৃত্বও দেবে। স্বাধীন, স্বাবলম্বী এবং গর্বিত ভারত — এটিই আমাদের লক্ষ্য।
