অপারেশন সিন্দুর চলাকালীন পাকিস্তানের বিস্তীর্ণ আকাশসীমায় ভারত কার্যত স্পষ্ট বিমান আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিল এবং সেই চাপেই ইসলামাবাদ ১০ মে ২০২৫ নাগাদ যুদ্ধবিরতির আবেদন জানাতে বাধ্য হয়—এমনই দাবি করেছে সুইৎজারল্যান্ডভিত্তিক একটি স্বনামধন্য সামরিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক। বিশদ এই গবেষণা অনুযায়ী, ৮৮ ঘণ্টার সংঘর্ষের শেষ পর্যায়ে পৌঁছনোর সময় ভারতীয় বায়ুসেনা এমন অবস্থানে ছিল, যেখানে তারা ইচ্ছেমতো দূরপাল্লার আঘাত হানতে পারছিল, অথচ পাকিস্তান বিমান বাহিনী কার্যত কার্যকর পাল্টা অভিযান চালানোর ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিল।
এই বিশ্লেষণটি প্রকাশ করেছে সুইৎজারল্যান্ডের পুলি শহরভিত্তিক Centre for Military History and Perspective Studies। গবেষণাটির লেখক সামরিক ইতিহাসবিদ আদ্রিয়েন ফন্তানেলাজ এবং এটি ফরাসি ভাষা থেকে অনুবাদ করেছেন ভারতের প্রাক্তন ফরাসি প্রতিরক্ষা অ্যাটাশে বেনেডিক্ট স্মিথ। গবেষণাপত্রটির পর্যালোচনা কমিটিতে ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত সুইস এয়ার ফোর্স মেজর জেনারেল ক্লদ মেয়ার, যিনি একসময় সুইস সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ ছিলেন, পাশাপাশি ছিলেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক জোসেফ হেনরোতাঁ ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ আর্থার লুসেন্তি।
গবেষণার মূল বক্তব্য অনুযায়ী, ১০ মে ২০২৫–এর সকাল নাগাদ এমন যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়, যা ইঙ্গিত দেয় যে ভারতীয় বায়ুসেনা পাকিস্তানের একটি বড় অংশের আকাশসীমায় বিমান আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিল। এর ফলেই ভারত দীর্ঘপাল্লার অস্ত্র ব্যবহার করে পাকিস্তানের অভ্যন্তরের অবকাঠামোর ওপর আঘাত চালিয়ে যেতে পেরেছিল, যতক্ষণ না তাদের হাতে ব্রাহ্মোস বা স্কাল্প–ইজি ধরনের মিসাইল মজুত ছিল।
প্রতিবেদনটি আরও বলছে, পাকিস্তান বিমান বাহিনী ৭ মে যেভাবে কিছু সফল অভিযান চালিয়েছিল, তা পুনরাবৃত্তি করার ক্ষমতা হারায়। কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে তাদের অগ্রবর্তী এয়ার সার্ভেইলেন্স রাডার ধ্বংস হওয়া, ভারতীয় এস–৪০০ ব্যবস্থার কারণে এডব্লিউএসি প্ল্যাটফর্মগুলির ঝুঁকির মুখে পড়া এবং পাকিস্তানের নিজস্ব হামলাগুলির বড় অংশ ভারতীয় প্রতিরক্ষায় ব্যর্থ হয়ে যাওয়া।
৭ মে রাতের প্রথম সংঘর্ষে ভারতীয় বায়ুসেনা দুটি আক্রমণ প্যাকেজ পাঠায়, যেখানে রাফাল ও মিরাজ ২০০০ বিমান অংশ নেয়। লক্ষ্য ছিল বাহাওয়ালপুরে জইশ–ই–মহম্মদের সদর দপ্তর এবং মুরিদকেতে লস্কর–ই–তৈয়বার ঘাঁটি। একটি ফরমেশন ইচ্ছাকৃতভাবে কম উচ্চতায় পাকিস্তানের আকাশসীমায় প্রবেশ করে ‘পপ–আপ’ আক্রমণ চালায়, যাতে শত্রুপক্ষ বাধ্য হয় প্রতিক্রিয়া দেখাতে। এর জবাবে পাকিস্তান ত্রিশটির বেশি যুদ্ধবিমান উড়ায় এবং দূরপাল্লার পিএল–১৫ এয়ার–টু–এয়ার মিসাইল নিক্ষেপ করে, যার মূল লক্ষ্য ছিল রাফাল বিমান।
ইসলামাবাদ দাবি করেছিল যে তারা ছয়টি ভারতীয় বিমান ভূপাতিত করেছে। তবে সুইস গবেষণায় দৃশ্যমান প্রমাণের ভিত্তিতে অন্তত একটি রাফাল, একটি মিরাজ ২০০০ এবং আরও একটি যুদ্ধবিমান—যা মিগ–২৯ অথবা সু–৩০ এমকেআই হতে পারে—নষ্ট হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বলা হয়েছে, একাধিক ভারতীয় পাইলট সফলভাবে আসা মিসাইল এড়িয়ে যেতে সক্ষম হন, যার প্রমাণ হিসেবে ভারতীয় ভূখণ্ডে পিএল–১৫ মিসাইলের খালি কেসিং পাওয়া গেছে।
এই বিষয়ে ভারতের চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ জেনারেল অনিল চৌহান আগেই বলেছিলেন, কতগুলি বিমান নামানো হয়েছে তার সংখ্যার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল কেন সেগুলি নামানো গেল। তাঁর বক্তব্যে ইঙ্গিত ছিল, সামগ্রিক অভিযানের ফলাফলই মূল বিষয়।
পাকিস্তানের পাল্টা অভিযানের বিশ্লেষণে গবেষণাটি জানিয়েছে, ৭ মে রাতেই পাকিস্তান প্রায় ৩০০টির বেশি ড্রোন ও জেএফ–১৭ বিমানের মাধ্যমে বড় আকারের আক্রমণ চালায়। চীনা উৎপত্তির সিএম–৪০০ একেজি মিসাইল ও বিভিন্ন ধরনের ড্রোন ব্যবহার করে ভারতের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করতে বাধ্য করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু এই কৌশল ভারতকে অপ্রস্তুত করতে পারেনি। চার দিনের সংঘর্ষে পাকিস্তানি ড্রোনের অর্ধেকের বেশি ধ্বংস হয়, আর ইলেকট্রনিক জ্যামিং ও স্পুফিং বড় ভূমিকা নেয়।
গবেষণায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ভারতীয় বিমান বাহিনীর আইএসি–সিসিএস এবং সেনাবাহিনীর আকাশতীর নেটওয়ার্কের সমন্বয়ের ওপর। এই সমন্বয়ের ফলে রাডার, অপটিক্যাল সেন্সর ও ইলেকট্রোম্যাগনেটিক তথ্য একত্র করে একটি সমন্বিত আকাশচিত্র তৈরি করা সম্ভব হয়। এর ফলে ভারতীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেবল তখনই সক্রিয় হয়েছে, যখন লক্ষ্য একেবারে ফায়ারিং এনভেলপের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। এতে রাডার দীর্ঘ সময় চালু রাখতে হয়নি এবং পাকিস্তান ভারতীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সঠিক অবস্থান নির্ণয়ে ব্যর্থ হয়।
৯ মে রাত থেকে ১০ মে ভোরের মধ্যে পাকিস্তান তৃতীয় ও সবচেয়ে বড় আক্রমণ চালালেও সেটিও ব্যর্থ হয়। এরপর ভোরে ভারতীয় বায়ুসেনা ব্রাহ্মোস, স্কাল্প–ইজি ও র্যাম্পেজ মিসাইল ব্যবহার করে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে একাধিক বিমানঘাঁটি ও সামরিক স্থাপনায় আঘাত হানে। সারগোধা, জ্যাকবাবাদ ও ভোলারি বিমানঘাঁটিতে এই হামলার ফলে রানওয়ে, হ্যাঙ্গার, রাডার ও সহায়ক অবকাঠামো গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ভারতের নিজস্ব মূল্যায়ন অনুযায়ী, এই আঘাতে পাকিস্তানের একাধিক এফ–১৬, একটি এডব্লিউএসি বিমান, একটি সি–১৩০ পরিবহন বিমান, বেশ কয়েকটি মাঝারি উচ্চতার ড্রোন এবং গুরুত্বপূর্ণ কমান্ড ও কন্ট্রোল কেন্দ্র ধ্বংস হয়। পাকিস্তান অবশ্য কিছু ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা করেছে।
সব মিলিয়ে, সুইস থিঙ্ক ট্যাঙ্কের এই গবেষণা বলছে, ১০ মে দুপুর নাগাদ পাকিস্তানি সামরিক নেতৃত্ব যুদ্ধবিরতির আবেদন জানাতে বাধ্য হয়। কারণ, ভারতের রাজনৈতিক ও সামরিক লক্ষ্য অর্জিত হয়েছিল—সন্ত্রাসী পরিকাঠামোয় আঘাত, পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়া প্রতিহত করা এবং আকাশে স্পষ্ট নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা।
তবে গবেষণাটি এটাও স্বীকার করেছে যে ৭ মে রাতের প্রাথমিক সংঘর্ষে ভারত একটি উল্লেখযোগ্য ধাক্কা খেয়েছিল এবং অন্তত একটি রাফাল হারানো পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিক প্রচারে সুবিধা দিয়েছিল। তবুও শেষ বিচারে, অপারেশন সিন্দুর দেখিয়েছে যে সমন্বিত বিমান প্রতিরক্ষা, দূরপাল্লার অস্ত্র এবং ধাপে ধাপে উত্তেজনা বৃদ্ধির কৌশলে ভারত সংঘর্ষের গতি ও পরিণতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছিল।
সূত্র – The Print
