Monday, April 20, 2026
HomeWorld Geopolitics & Military Affairsগোপন পারমাণবিক পরীক্ষা ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র–চীন সংঘাত: অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে শূন্যতা ও নতুন স্নায়ুযুদ্ধের...

গোপন পারমাণবিক পরীক্ষা ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র–চীন সংঘাত: অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে শূন্যতা ও নতুন স্নায়ুযুদ্ধের আশঙ্কা ।

 

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শুরুতেই আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে পড়েছে। জেনেভায় অনুষ্ঠিত একটি বৈশ্বিক নিরস্ত্রীকরণ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি অভিযোগ করেছে যে চীন ২০২০ সালে গোপনে পারমাণবিক বিস্ফোরণ পরীক্ষা চালিয়েছিল। এই অভিযোগ এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে শেষ কার্যকর কৌশলগত অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি New START–এর মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। ফলে ১৯৭২ সালের পর এই প্রথমবারের মতো বিশ্বের দুই বৃহত্তম পারমাণবিক শক্তির মধ্যে কোনও বাধ্যতামূলক চুক্তি কার্যকর নেই।

জেনেভার সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি থমাস ডি ন্যানো দাবি করেন, ওয়াশিংটনের কাছে এমন প্রমাণ রয়েছে যা দেখায় যে চীন ২০২০ সালের ২২ জুন একটি পারমাণবিক বিস্ফোরণ পরীক্ষা চালিয়েছিল। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই পরীক্ষা ছিল শত শত টনের সমমানের শক্তির এবং চীন ইচ্ছাকৃতভাবে এটিকে আড়াল করার চেষ্টা করেছিল। তিনি বলেন, চীনা সামরিক বাহিনী ‘ডিকাপলিং’ নামের একটি কৌশল ব্যবহার করে ভূকম্পন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করেছে, যাতে বিস্ফোরণের স্পষ্ট সংকেত ধরা না পড়ে। ডি ন্যানোর অভিযোগ অনুযায়ী, এই ধরনের কার্যকলাপ আন্তর্জাতিক পারমাণবিক পরীক্ষা নিষেধাজ্ঞার নীতির সরাসরি লঙ্ঘন।

চীনের পক্ষ থেকে এই অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার না করলেও তীব্র প্রতিক্রিয়া এসেছে। নিরস্ত্রীকরণ বিষয়ে চীনের রাষ্ট্রদূত শেন জিয়ান বলেন, বেইজিং বরাবরই পারমাণবিক ইস্যুতে দায়িত্বশীল ও সংযত আচরণ করেছে। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ইচ্ছাকৃতভাবে তথাকথিত ‘চীন পারমাণবিক হুমকি’কে অতিরঞ্জিত করছে। শেনের মতে, অস্ত্র প্রতিযোগিতা বাড়ার জন্য আসল দায়ী যুক্তরাষ্ট্র নিজেই, কারণ তার নীতিই বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিবেশকে অস্থিতিশীল করছে।

এই বিতর্ক আরও জটিল হয়ে উঠেছে কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উভয়ই Comprehensive Nuclear Test Ban Treaty–এ স্বাক্ষর করলেও এখনও সেটি আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করেনি। এই চুক্তি কার্যকর হলে যে কোনও ধরনের পারমাণবিক বিস্ফোরণ পরীক্ষা নিষিদ্ধ হতো। রাশিয়া একসময় এই চুক্তি অনুমোদন করেছিল, কিন্তু ২০২৩ সালে তা প্রত্যাহার করে নেয়। ফলে বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক পরীক্ষার ওপর কার্যত কোনও সর্বজনীন বাধ্যতামূলক কাঠামো আর অবশিষ্ট নেই।

নিউ স্টার্ট চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়াকে ঘিরে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে। এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্র ও ওয়ারহেড মোতায়েনের ওপর সীমা বেঁধে দিয়েছিল। এর অবসানের ফলে উভয় দেশই এখন তাত্ত্বিকভাবে তাদের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার বাড়াতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি নতুন ও বিস্তৃত অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তির কথা বলছেন, যেখানে রাশিয়ার পাশাপাশি চীনকেও অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী Marco Rubio এক বিবৃতিতে বলেন, রাশিয়া ও চীন যদি তাদের দায়িত্ব এড়িয়ে গিয়ে পারমাণবিক শক্তি বাড়াতে থাকে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র স্থির বসে থাকবে না। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ওয়াশিংটন তার পারমাণবিক প্রতিরোধ ক্ষমতা আধুনিক ও বিশ্বাসযোগ্য রাখতে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেবে। যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থান স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, নিউ স্টার্ট–পরবর্তী যুগে পারমাণবিক অস্ত্র আধুনিকীকরণ একটি বাস্তবতা হয়ে উঠছে।

ডি ন্যানো জেনেভার মঞ্চে আরও বলেন, ২০২৬ সালের বাস্তবতায় কেবল দ্বিপাক্ষিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি আর যথেষ্ট নয়। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্র এখন একাধিক পারমাণবিক শক্তির হুমকির মুখোমুখি, তাই নতুন কোনও চুক্তিকে অবশ্যই বহুপাক্ষিক হতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে চীনের পারমাণবিক ওয়ারহেডের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এই সম্ভাবনাই ওয়াশিংটনের উদ্বেগের মূল কারণ।

চীন অবশ্য এই যুক্তি মানতে নারাজ। বেইজিংয়ের দাবি, তাদের পারমাণবিক ভাণ্ডার এখনও যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার তুলনায় অনেক কম। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অনুমান অনুযায়ী, চীনের হাতে বর্তমানে প্রায় ৬০০ ওয়ারহেড রয়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার প্রত্যেকের কাছেই প্রায় চার হাজারের মতো ওয়ারহেড মজুত আছে। চীনের বক্তব্য, এত বড় বৈষম্যের মধ্যে তাদের ওপর একই ধরনের দায়িত্ব চাপানো অন্যায্য।

জেনেভার সম্মেলনে উপস্থিত কূটনীতিকরা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই অভিযোগ নতুন এবং উদ্বেগজনক। কারণ, যদি সত্যিই ২০২০ সালে কোনও গোপন পরীক্ষা হয়ে থাকে, তাহলে তা আন্তর্জাতিক আস্থার জন্য বড় ধাক্কা। স্লোভাকিয়াভিত্তিক নিরাপত্তা গবেষণা সংস্থা গ্লোবসেকের পারমাণবিক বিশেষজ্ঞ টোমাস নাগি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইচ্ছাকৃতভাবে এই সময়টিকেই বেছে নিয়েছে। তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ওয়াশিংটন বুঝে গেছে যে আগামী কয়েক বছরে চীনের সঙ্গে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে কোনও ইতিবাচক অগ্রগতি হওয়ার সম্ভাবনা কম, তাই তারা এখন প্রকাশ্যে এই তথ্য সামনে আনছে।

এই সবের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। ট্রাম্প সম্প্রতি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বাণিজ্য ও নিরাপত্তা ইস্যুতে ‘ইতিবাচক’ আলোচনা করেছেন বলে দাবি করেছেন এবং এপ্রিল মাসে বেইজিং সফরের কথাও রয়েছে। কিন্তু পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এই নতুন অভিযোগ দুই দেশের মধ্যে অবিশ্বাস আরও গভীর করতে পারে।

রাশিয়ার প্রতিক্রিয়াও এই সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ। রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ জানিয়েছেন, মস্কো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংলাপের পক্ষে থাকলেও সব ধরনের পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত। রাশিয়ার মতে, যদি নতুন কোনও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আলোচনা হয়, তাহলে ন্যাটোর পারমাণবিক শক্তিধর সদস্য ব্রিটেন ও ফ্রান্সকেও তাতে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। তবে এই দুই দেশ সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।

ব্রিটেন ও ফ্রান্স উভয়ই জেনেভার মঞ্চে বলেছেন যে, বর্তমান সময়ে পারমাণবিক নীতির দুর্বলতা অভূতপূর্ব পর্যায়ে পৌঁছেছে। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের মতো বৃহৎ পারমাণবিক শক্তিগুলির মধ্যে কোনও সমঝোতা না হলে বৈশ্বিক নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।

নিউ স্টার্টের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার ফলে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা পূরণ করা সহজ হবে না। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, নতুন কোনও পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে বছরের পর বছর লেগে যেতে পারে। ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রতিযোগিতা এই আলোচনাকে আরও জটিল করে তুলছে। এর ফলে ভুল বোঝাবুঝি ও ভুল হিসাবের ঝুঁকি বাড়ছে, যা যে কোনও সময় বড় সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে চীনের বিরুদ্ধে গোপন পারমাণবিক পরীক্ষার অভিযোগ কেবল একটি কূটনৈতিক সংঘাত নয়, বরং নিউ স্টার্ট–পরবর্তী বিশ্বে পারমাণবিক শাসনব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে এক গভীর প্রশ্ন। যদি বৃহৎ শক্তিগুলি একে অপরের ওপর আস্থা হারায় এবং নিয়ন্ত্রণমূলক কাঠামো ভেঙে পড়ে, তাহলে অস্ত্র প্রতিযোগিতা আবারও শীতল যুদ্ধের মতো বিপজ্জনক পথে ফিরে যেতে পারে।

জেনেভার এই অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ দেখিয়ে দিচ্ছে যে বৈশ্বিক পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এখন এক সংকটময় মোড়ে দাঁড়িয়ে। নতুন চুক্তি, নতুন বিশ্বাস ও নতুন কাঠামো ছাড়া এই শূন্যতা পূরণ করা কঠিন। আর সেই শূন্যতা যত দীর্ঘ হবে, বিশ্ব তত বেশি অনিশ্চিত ও বিপজ্জনক হয়ে উঠবে।

সোর্স – Reuters

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

Recent Comments