বাংলাদেশে নতুন প্রধানমন্ত্রী তারিক রহমান শপথ নেওয়ার পরপরই ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নতুনভাবে গড়ে তোলার উদ্যোগ শুরু করেছে। দীর্ঘদিন শেখ হাসিনার সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার কারণে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দিল্লির অবস্থান কিছুটা অস্বস্তিকর হয়ে পড়েছিল। এখন নতুন সরকারের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ স্থাপন করে সেই দূরত্ব কমানোর কৌশল নিচ্ছে ভারত। দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে এই পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক কেবল কূটনৈতিক নয়, বরং নিরাপত্তা, বাণিজ্য, সংযোগ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
শেখ হাসিনার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুই দেশের মধ্যে কিছুটা সন্দেহ ও অস্বস্তির পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। বাংলাদেশ থেকে হাসিনার প্রত্যর্পণের দাবি, সীমান্ত ইস্যু, সংখ্যালঘু প্রসঙ্গ এবং রাজনৈতিক বক্তব্য নিয়ে পারস্পরিক অবিশ্বাস বাড়ে। এই পরিস্থিতিতে ভারতের ওপর একপক্ষীয় সমর্থনের অভিযোগ ওঠে। ফলে নতুন সরকার আসার পর দিল্লি বুঝতে পারে যে ভবিষ্যতে কোনো একক রাজনৈতিক দলের ওপর নির্ভরশীলতা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। সেই কারণে এখন বহুমাত্রিক রাজনৈতিক যোগাযোগ গড়ে তোলার দিকে জোর দেওয়া হচ্ছে।
২০২৬ সালের নির্বাচনে বিএনপি বড় জয় পাওয়ার পর তারিক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিনের আওয়ামী লীগ–বিএনপি দ্বন্দ্বের পরে ক্ষমতার এই পরিবর্তন ভারতের জন্য নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ তৈরি করেছে। দিল্লিকে এখন নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে কাজ করার পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ভারসাম্যও বুঝে এগোতে হবে।
ভারতের প্রধান উদ্বেগের জায়গা হলো সীমান্ত নিরাপত্তা। প্রায় চার হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ এই সীমান্তে অতীতে জঙ্গি সংগঠন ও বিচ্ছিন্নতাবাদী কার্যকলাপ দমনে দুই দেশের সহযোগিতা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন সরকার সেই সহযোগিতা বজায় রাখবে কি না, তা এখন দিল্লির কাছে বড় প্রশ্ন। একই সঙ্গে উত্তর–পূর্ব ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ভৌগোলিক সংযোগ ভারতের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ট্রানজিট, রেল ও সড়ক যোগাযোগ, বন্দর ব্যবহারের মতো প্রকল্পগুলো রাজনৈতিক সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল।
আরেকটি বড় বিষয় হলো চীন ফ্যাক্টর। বাংলাদেশে চীনের অবকাঠামো বিনিয়োগ ও সামরিক সহযোগিতা বেড়েছে। ভারত চাইছে ঢাকা যেন সম্পূর্ণভাবে বেইজিং–নির্ভর না হয়ে ভারসাম্যপূর্ণ নীতি অনুসরণ করে। এই প্রেক্ষাপটে দিল্লির কৌশল হলো বহুদলীয় যোগাযোগ। এখন শুধু আওয়ামী লীগ নয়, বিএনপি, সিভিল সোসাইটি এবং অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো হচ্ছে। পার্লামেন্টারি কূটনীতি এবং ট্র্যাক–টু ডিপ্লোম্যাসির মাধ্যমেও সম্পর্কের নতুন ভিত্তি তৈরি করার চেষ্টা চলছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নতুন প্রধানমন্ত্রীকে পাঠানো চিঠিতে যৌথ নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির কথা উল্লেখ করেছেন। এটি স্পষ্ট বার্তা যে ভারত নিরাপত্তা সহযোগিতা বজায় রাখতে আগ্রহী। অর্থনৈতিক সম্পর্কও এখানে বড় ভূমিকা রাখছে। বিদ্যুৎ রপ্তানি, সীমান্ত বাণিজ্য, রেল ও সড়ক সংযোগ এবং লজিস্টিকস প্রকল্প দুই দেশের অর্থনীতিকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। রাজনৈতিক পরিবর্তন হলেও এই অর্থনৈতিক ভিত্তি অক্ষুণ্ণ রাখা ভারতের লক্ষ্য।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কিছু বক্তব্য দিল্লিতে উদ্বেগ তৈরি করেছিল, বিশেষ করে উত্তর–পূর্ব ভারত নিয়ে সার্বভৌমত্ব–কেন্দ্রিক মন্তব্য। ফলে নতুন সরকার আসার সঙ্গে সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রয়োজন আরও স্পষ্ট হয়। তবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এখন বহুমাত্রিক। বিএনপি সরকার, শক্তিশালী বিরোধী জোট, সংবিধান সংস্কার বিতর্ক এবং নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ভারতের জন্য কূটনৈতিকভাবে জটিল পরিবেশ তৈরি করছে।
দিল্লির কৌশলগত লক্ষ্য তিনটি বিষয়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমত একটি স্থিতিশীল ও বন্ধুত্বপূর্ণ বাংলাদেশ, দ্বিতীয়ত সীমান্ত নিরাপত্তায় ধারাবাহিক সহযোগিতা, এবং তৃতীয়ত চীনের প্রভাবের ভারসাম্য রক্ষা। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে আঞ্চলিক সংযোগ উদ্যোগ যেমন BBIN ও BIMSTEC, যা দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক একীকরণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন প্রধানমন্ত্রীকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ দেওয়া হয়েছে। এই সফর হলে নিরাপত্তা সহযোগিতা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য ভারসাম্য, জ্বালানি, বিদ্যুৎ এবং সংযোগ প্রকল্প নিয়ে উচ্চ পর্যায়ের আলোচনা হতে পারে। সফল সফর দুই দেশের সম্পর্ক দ্রুত স্থিতিশীল করতে পারে।
তবে কিছু ঝুঁকি রয়ে গেছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের বিরুদ্ধে হস্তক্ষেপের অভিযোগ মাঝে মাঝে উঠে আসে, যা জনমতকে প্রভাবিত করে। সীমান্তে হতাহতের ঘটনা রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক কারণে ঢাকা চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে চাইবে। ফলে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি বজায় রাখা বাংলাদেশের জন্যও প্রয়োজনীয়।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান বঙ্গোপসাগরের কেন্দ্রে হওয়ায় ইন্দো–প্যাসিফিক কৌশল, সমুদ্র নিরাপত্তা এবং বাণিজ্য রুটের ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। ভারত চাইছে এই ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশকে আঞ্চলিক অংশীদার হিসেবে ধরে রাখতে।
ভবিষ্যতের দিকে তাকালে তিনটি সম্ভাব্য পথ দেখা যায়। একটি হলো সহযোগিতামূলক সম্পর্ক যেখানে নিরাপত্তা ও অর্থনীতি কেন্দ্রীয় ভূমিকা নেবে। দ্বিতীয়টি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি যেখানে বাংলাদেশ ভারত ও চীনের সঙ্গে সমান দূরত্ব বজায় রাখবে। তৃতীয়টি হলো উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্ক, যদি সীমান্ত বা রাজনৈতিক ইস্যু বাড়ে। দিল্লি বর্তমানে প্রথম পথটি বাস্তবায়নের জন্য কাজ করছে।
বাংলাদেশের নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক পুনর্গঠনের উদ্যোগ কেবল কূটনৈতিক সৌজন্য নয়, বরং নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও আঞ্চলিক ভারসাম্যের সঙ্গে যুক্ত বাস্তববাদী পদক্ষেপ। উচ্চ পর্যায়ের সংলাপ দ্রুত শুরু হলে সীমান্ত স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে, অর্থনৈতিক সংযোগ অব্যাহত থাকবে এবং দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত স্থিতিশীলতা শক্তিশালী হবে।
