Friday, April 24, 2026
HomeEditorials, Opinion & Strategic Analysisপ্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ইজরায়েল সফর: ভারত-ইজরায়েল সম্পর্কের নতুন অধ্যায়।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ইজরায়েল সফর: ভারত-ইজরায়েল সম্পর্কের নতুন অধ্যায়।

২০২৬ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ইজরায়েলে দু’দিনের রাষ্ট্রীয় সফর শেষ হয়েছে। এই সফরকে অনেকেই বলছেন ভারত আর ইজরায়েলের মধ্যে সম্পর্কের একটা ঐতিহাসিক মোড়। দুই দেশের নেতারা ঘোষণা করেছেন যে এখন থেকে তাদের সম্পর্ককে ‘শান্তি, উদ্ভাবন এবং সমৃদ্ধির জন্য বিশেষ কৌশলগত অংশীদারিত্ব’ (Special Strategic Partnership for Peace, Innovation, and Prosperity) বলা হবে। এটা শুধু নামের পরিবর্তন নয়, বরং দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতাকে আরও গভীর, বহুমুখী এবং ভবিষ্যতমুখী করে তোলার একটা বড় পদক্ষেপ।

এই সফরের আগে ভারত আর ইজরায়েলের সম্পর্ক অনেকদিন ধরে মজবুত হয়ে আসছিল। ১৯৯২ সালে পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক শুরু হওয়ার পর থেকে প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, কৃষি, জল ব্যবস্থাপনা—এসব ক্ষেত্রে সহযোগিতা বেড়েছে। কিন্তু ২০১৭ সালে মোদির প্রথম ইজরায়েল সফরের পর এই সম্পর্ক খোলাখুলি এবং দ্রুতগতিতে এগিয়েছে। এবারের সফরে সেই ধারাবাহিকতা আরও শক্তিশালী হয়েছে। দুই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু একসঙ্গে অনেকগুলো চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন, যার সংখ্যা ১৬-এরও বেশি। এই চুক্তিগুলো কভার করেছে প্রতিরক্ষা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), সাইবার নিরাপত্তা, কৃষি, জল সংরক্ষণ, শিক্ষা, শ্রমিকের গতিশীলতা, ডিজিটাল পেমেন্ট এবং আরও অনেক কিছু।

সফরের প্রথম দিন, ২৫ ফেব্রুয়ারি, মোদি ইজরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটে (Knesset) ভাষণ দেন। এটা ছিল একটা অভূতপূর্ব ঘটনা—কোনো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী এর আগে নেসেটে ভাষণ দেননি। নেসেটের প্লেনাম সেশনে তাঁর ভাষণ শোনার জন্য সাংসদ, অতিথি এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিরা ভর্তি ছিলেন। ভাষণ শেষ হলে সবাই দাঁড়িয়ে দীর্ঘক্ষণ করতালি দেন, যা দুই দেশের মধ্যে গভীর বন্ধুত্বের প্রতীক। মোদি তাঁর ভাষণে বলেন যে ভারত আর ইজরায়েল দুটোই গণতান্ত্রিক দেশ, যারা কঠিন সময়ে লড়াই করতে জানে এবং একে অপরের প্রতি সম্মান রাখে। তিনি ৭ অক্টোবরের হামাসের হামলাকে ‘বর্বর সন্ত্রাসী আক্রমণ’ বলে নিন্দা করেন এবং বলেন যে মানবতা কখনো সংঘাতের শিকার হওয়া উচিত নয়। গাজায় শান্তির জন্য জাতিসংঘের নেতৃত্বে উদ্যোগকে সমর্থন করেন। ভাষণে তিনি প্রযুক্তি, কৃষি, প্রতিরক্ষা এবং উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে একসঙ্গে কাজ করার ওপর জোর দেন। ভাষণের পর নেসেট স্পিকার তাঁকে ‘স্পিকার অফ দ্য নেসেট মেডেল’ দেন, যা তাঁর ভূমিকার স্বীকৃতি।

দ্বিতীয় দিন, ২৬ ফেব্রুয়ারি, মোদি ইয়াদ ভাশেম (Yad Vashem) হলোকস্ট মেমোরিয়ালে যান। সেখানে তিনি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং হল অফ রিমেমব্রান্সে চিরন্তন শিখা প্রজ্জ্বলিত করেন। এরপর নেতানিয়াহুর সঙ্গে বিস্তারিত বৈঠক হয়। বৈঠকে দুই নেতা সম্পর্ককে নতুন স্তরে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তারা বলেন যে এই বিশেষ কৌশলগত অংশীদারিত্ব শান্তি, উদ্ভাবন এবং সমৃদ্ধির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠবে। প্রতিরক্ষায় যৌথ উন্নয়ন, উৎপাদন এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। তারা ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট (FTA) নিয়ে আলোচনা ত্বরান্বিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে এই সফর খুব গুরুত্বপূর্ণ। আগে ভারত ইজরায়েল থেকে অনেক অস্ত্র কিনত, কিন্তু এখন তারা যৌথভাবে নতুন প্রযুক্তি তৈরি করবে। লেজার-ভিত্তিক আয়রন বিম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ড্রোন, মিসাইল ডিফেন্স—এসব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সাইবার সিকিউরিটি, AI-ভিত্তিক নিরাপত্তা এবং ক্রিটিক্যাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার রক্ষায় সহযোগিতা বাড়বে। দুই দেশের সেনাবাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আরও কাছাকাছি আসবে।

অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও বাড়ছে। ভারতের UPI (Unified Payments Interface) এখন ইজরায়েলে চালু হয়েছে। এতে পর্যটক, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ মানুষ খুব সহজে পেমেন্ট করতে পারবে। হোটেল বুকিং, শপিং, খাবার—সবকিছু ডিজিটালভাবে হবে। এছাড়া পরের পাঁচ বছরে ইজরায়েলে আরও ৫০,০০০ ভারতীয় শ্রমিক যাবে। তারা ম্যানুফ্যাকচারিং, কেয়ারগিভিং, কনস্ট্রাকশন এবং অন্যান্য খাতে কাজ করবে। ইজরায়েলে শ্রমিকের অভাব মেটাতে এটা সাহায্য করবে, আর ভারতীয় যুবকদের জন্য বিদেশে চাকরির সুযোগ বাড়বে।

কৃষি এবং জল ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা অনেকদিনের। ‘ভিলেজেস অফ এক্সেলেন্স’ প্রোগ্রামের মাধ্যমে ভারতের গ্রামে ইজরায়েলি প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষি উন্নত করা হবে। ড্রিপ ইরিগেশন, স্মার্ট ফার্মিং, সয়েল হেলথ—এসব নিয়ে কাজ চলবে। খাদ্য নিরাপত্তা এবং গ্রামীণ উন্নয়নের জন্য এটা খুব উপকারী হবে।

সফরে ব্যক্তিগত উষ্ণতাও ছিল। নেতানিয়াহু একটা প্রাইভেট ডিনারে নেহরু জ্যাকেট পরে মোদিকে স্বাগত জানান। এটা ছোট মনে হলেও দুই নেতার গভীর বন্ধুত্বের প্রতীক। এই ব্যক্তিগত সম্পর্ক রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোকে আরও মসৃণ করে।

এই সফরে ফিলিস্তিনি নেতৃত্বের সঙ্গে কোনো বৈঠক হয়নি। এটা ভারতের ‘ডি-হাইফেনেশন’ নীতির উদাহরণ—ইজরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ককে ফিলিস্তিনের সঙ্গে জড়িয়ে না ফেলা। ভারত নিজের স্বার্থ অনুযায়ী সম্পর্ক গড়ছে। একইসঙ্গে মোদি গাজায় শান্তির পক্ষে কথা বলেছেন এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন।

ভবিষ্যতে এই অংশীদারিত্ব ইন্দো-প্যাসিফিক এবং পশ্চিম এশিয়ায় স্থিতিশীলতা আনতে সাহায্য করবে। IMEC (ইন্ডিয়া-মিডল ইস্ট-ইউরোপ ইকোনমিক করিডর), I2U2 (ইন্ডিয়া-ইজরায়েল-ইউএই-ইউএস) এর মতো প্রকল্পে সহযোগিতা বাড়বে। দুই দেশ একসঙ্গে উদ্ভাবন, প্রযুক্তি এবং নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করে বিশ্বে নতুন উদাহরণ স্থাপন করবে।

এই সফর শুধু দুই দেশের জন্য নয়, পুরো অঞ্চলের জন্য একটা ইতিবাচক বার্তা। ভারত আর ইজরায়েলের এই নতুন অধ্যায় শান্তি, উন্নয়ন এবং সমৃদ্ধির পথ দেখাবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

Recent Comments