Monday, April 20, 2026
HomeEditorials, Opinion & Strategic Analysisভারতের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের নতুন অধ্যায়: গালাথিয়া বে-তে ₹৪৮,৮৬২ কোটি টাকার মেগা ট্রান্সশিপমেন্ট...

ভারতের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের নতুন অধ্যায়: গালাথিয়া বে-তে ₹৪৮,৮৬২ কোটি টাকার মেগা ট্রান্সশিপমেন্ট পোর্ট, কলম্বো-সিঙ্গাপুরের নির্ভরতা কমবে।

 ভারতের সমুদ্রপথে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সূচনা হতে চলেছে। অর্থ মন্ত্রকের পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ অ্যাপ্রেইজাল কমিটি (PPPAC) সম্প্রতি গ্রেট নিকোবর দ্বীপের গালাথিয়া বে-তে আন্তর্জাতিক কনটেইনার ট্রান্সশিপমেন্ট পোর্ট (ICTP) প্রকল্পের জন্য ₹৪৮,৮৬২ কোটি টাকার বিনিয়োগ অনুমোদন করেছে। এই মেগা প্রকল্পটি ভারতকে বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত শিপিং রুটের কাছে একটি শক্তিশালী ট্রান্সশিপমেন্ট হাবে পরিণত করবে এবং দীর্ঘদিনের কলম্বো ও সিঙ্গাপুর বন্দরের উপর নির্ভরতা কমিয়ে দেবে।

প্রকল্পের বিস্তারিত তথ্য অনুসারে, গালাথিয়া বে পোর্টের সর্বোচ্চ ক্ষমতা হবে ১১.৮ মিলিয়ন TEU (টুয়েন্টি-ফুট ইকুইভ্যালেন্ট ইউনিট)। এটি দুটি প্রধান পর্যায়ে বিকশিত হবে। প্রথম পর্যায়ে (IA এবং IB সাব-ফেজ সহ) ৫.৬ মিলিয়ন TEU ক্ষমতা তৈরি হবে, দ্বিতীয় পর্যায়ে আরও ৬.২ মিলিয়ন TEU যোগ হবে। সঙ্গে থাকবে ১২টি কনটেইনার বার্থ, ২টি POL (পেট্রোলিয়াম, অয়েল অ্যান্ড লুব্রিকেন্টস) বার্থ এবং ১টি পোর্ট ক্রাফট বার্থ। প্রকল্পটি ৫০ বছরের কনসেশন পিরিয়ডে একটি জয়েন্ট ভেঞ্চারের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে, যেখানে ভারতীয় নিয়ন্ত্রিত সত্তা ৫৫ শতাংশ এবং কয়েকটি রাষ্ট্রায়ত্ত বন্দর ৪৫ শতাংশ অংশীদারিত্ব রাখবে। বিদেশি পোর্ট অপারেটরদের এই প্রকল্পে অংশগ্রহণের অনুমতি দেওয়া হবে না—এটি সম্পূর্ণরূপে স্ট্র্যাটেজিক ও জাতীয় নিরাপত্তার বিবেচনায় নেওয়া সিদ্ধান্ত।

গালাথিয়া বে মালাক্কা স্ট্রেইটের মাত্র ৪০ নটিক্যাল মাইল দূরে অবস্থিত, যেখান দিয়ে বিশ্বের প্রায় ৩৫ শতাংশ সমুদ্র বাণিজ্য চলাচল করে। প্রাকৃতিক জলের গভীরতা ২০ মিটারেরও বেশি, যা বিশ্বের সবচেয়ে বড় কনটেইনার জাহাজগুলো (২৮,০০০ TEU পর্যন্ত) সরাসরি ভিড়তে সক্ষম করবে। কলম্বো, সিঙ্গাপুর বা পোর্ট ক্লাং-এর তুলনায় এখান থেকে জাহাজের ডেভিয়েশন সময় অনেক কম হবে। ফলে ভারতীয় পূর্ব উপকূলের বন্দর, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের কার্গো এখানে ট্রান্সশিপ করা অনেক সাশ্রয়ী ও দ্রুত হবে।

বর্তমানে ভারতের প্রায় ৭৫ শতাংশ ট্রান্সশিপমেন্ট কার্গো বিদেশি বন্দরে হয়, যার মধ্যে ৪৫ শতাংশ কলম্বোতে। এতে প্রতি বছর ভারতকে ২০০-২২০ মিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত খরচ করতে হয়। গালাথিয়া বে পোর্ট চালু হলে এই অর্থ দেশের অর্থনীতিতেই থাকবে এবং লজিস্টিক খরচ কমবে। এটি ‘আত্মনির্ভর ভারত’ ও ‘সাগরমালা’ প্রকল্পের একটি বড় অংশ।

শুধু বাণিজ্য নয়, এই পোর্ট ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ভারতের স্ট্র্যাটেজিক উপস্থিতি অনেক বাড়াবে। গ্রেট নিকোবর দ্বীপ ইন্ডিয়ান ওশান রিজিয়নের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত। পোর্টের পাশাপাশি এখানে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, পাওয়ার প্ল্যান্ট ও টাউনশিপও গড়ে উঠবে। বিশেষজ্ঞরা একে “ইন্ডিয়ান পার্ল হারবার” বলে অভিহিত করছেন। এটি চীনের মালাক্কা ডিলেমা ও আঞ্চলিক প্রভাবকে কাউন্টার করতে সাহায্য করবে। ভারতীয় নৌবাহিনীর জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ডুয়াল-ইউজ (সিভিল-মিলিটারি) অবকাঠামো হবে।

প্রকল্পটি গ্রেট নিকোবর হলিস্টিক ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের অংশ। পরিবেশগত ছাড়পত্র নিয়ে বিতর্কের পর ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনাল (NGT) সম্প্রতি প্রকল্পটিকে সমর্থন করে রায় দিয়েছে। প্রথম পর্যায়ের কাজ ২০২৮ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কামরাজার পোর্ট লিমিটেড এই প্রকল্পের বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দেবে।

যেকোনো বড় প্রকল্পের মতো এখানেও পরিবেশবাদীরা উদ্বিগ্ন। গ্রেট নিকোবর দ্বীপে লেদারব্যাক সামুদ্রিক কচ্ছপের আবাসস্থল, প্রবাল প্রাচীর, ম্যানগ্রোভ ও বিরল প্রজাতির জীবজন্তু রয়েছে। প্রকল্পের জন্য ১৩০ বর্গ কিলোমিটারেরও বেশি বনাঞ্চল প্রভাবিত হবে বলে আশঙ্কা। NGT অবশ্য পরিবেশগত শর্তাবলী কঠোরভাবে মেনে চলার নির্দেশ দিয়েছে এবং বলেছে যে নির্মাণ এলাকায় উল্লেখযোগ্য প্রবাল প্রাচীর নেই। সরকার দাবি করছে, টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে পরিবেশ সুরক্ষা সমান গুরুত্ব পাবে।

এই পোর্ট শুধু অর্থনৈতিক নয়, ভূ-রাজনৈতিকভাবেও গেম চেঞ্জার। QUAD, IPEF এবং ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের অংশ হিসেবে এটি ভারতকে আঞ্চলিক লজিস্টিক হাবে পরিণত করবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI)-এর বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া। পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং আফ্রিকার সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য আরও সহজ ও সস্তা হবে।

এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ভারতের সমুদ্র বাণিজ্যে নতুন দিগন্ত খুলবে। কলম্বো ও সিঙ্গাপুরের মতো বিদেশি বন্দরের উপর নির্ভরতা কমে গেলে দেশের লজিস্টিক খাত শক্তিশালী হবে, কর্মসংস্থান বাড়বে এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বৃদ্ধি পাবে।

তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়—প্রতিযোগিতা, টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম, দক্ষতা এবং পরিবেশ সুরক্ষা। সরকার যদি এগুলো সফলভাবে মোকাবিলা করে, তাহলে গালাথিয়া বে শুধু একটি বন্দর নয়, ভারতের মেরিটাইম শক্তির প্রতীক হয়ে উঠবে।

ইন্দো-প্যাসিফিকের সমুদ্রপথে খেলা আস্তে আস্তে বদলে যাচ্ছে—এবং এবার ভারত সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছে।

 

সূত্র: অর্থনৈতিক টাইমস

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

Recent Comments