ভারতের অসামরিক হেলিকপ্টার বাজারে নতুন Final Assembly Line বা FAL স্থাপনের খবর নিঃসন্দেহে প্রথম নজরে ইতিবাচক মনে হয়। বিশেষ করে যখন টাটা বা আদানির মতো বড় শিল্পগোষ্ঠী এই কাজে যুক্ত হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই আশা তৈরি হয় যে ভবিষ্যতে ধীরে ধীরে কম্পোনেন্ট লোকালাইজেশন হবে এবং একসময় নিজেদের মেধাস্বত্ব বা IPR গড়ে উঠবে। অসামরিক ক্ষেত্রে এই ধরনের FAL-এর একটি বাস্তব প্রয়োজনও আছে, কারণ HAL-এর ধ্রুব ও LUH হেলিকপ্টার মূলত সামরিক চাহিদা পূরণেই ব্যস্ত। ফলে সিভিল মার্কেটে একটি শূন্যতা তৈরি হয়েছে, যেখানে এই ধরনের উদ্যোগ কিছুটা হলেও সেই ঘাটতি পূরণ করতে পারে। ধ্রুব NG এলে হয়তো HAL সিভিল মার্কেটেও অল্প কিছু অংশীদারিত্ব পাবে, তবে আপাতত ফোকাস যে সামরিক প্রয়োজনেই, তা স্পষ্ট।
কিন্তু সমস্যা শুরু হয় যখন এই FAL-ভিত্তিক মডেলকে সামরিক ক্ষেত্রেও একইভাবে প্রয়োগ করার চেষ্টা করা হয়। H125M বা লিওনার্দোর সামরিক হেলিকপ্টারের মতো প্ল্যাটফর্ম যদি শুধু অ্যাসেম্বলি বা সীমিত AIT-এর মাধ্যমে আনা হয়, তাহলে সেটাকে প্রকৃত অর্থে আত্মনির্ভরতা বলা কঠিন। সামরিক ক্ষেত্রে শুধু স্ক্রু ড্রাইভার প্রযুক্তি দিয়ে কাজ চালালে দীর্ঘমেয়াদে কোনও গভীর সক্ষমতা তৈরি হয় না। হ্যাঁ, লিজিং একটি সাময়িক সমাধান হতে পারে এবং রপ্তানি অবশ্যই স্বাগত, কিন্তু সেটাও তখনই অর্থবহ যখন দেশের নিজস্ব ডিজাইন ও উৎপাদন সক্ষমতা সমান্তরালে বাড়ে।
ভারতের প্রতিরক্ষা খাতে বেসরকারি ক্ষেত্রের বড় ভূমিকা থাকা দরকার, এতে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু হেলিকপ্টারের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, দেশের দুই বৃহত্তম শিল্পগোষ্ঠী তুলনামূলকভাবে সহজ পথটাই বেছে নিচ্ছে। একের পর এক FAL বসানো সংবাদ শিরোনামে ভালো শোনালেও, তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে আত্মনির্ভরতা নিশ্চিত করে না। যদি এই উদ্যোগগুলির সঙ্গে প্রকৃত ডিজাইন, সিস্টেম ইন্টিগ্রেশন ও ভবিষ্যৎ উন্নয়নের ক্ষমতা যুক্ত না হয়, তাহলে এগুলি মূলত স্বল্পমেয়াদি আর্থিক লাভের প্রকল্প হয়েই থাকবে।
HAL-এর ALH ও LUH নিয়ে নানা বিতর্ক থাকলেও, এই হেলিকপ্টারগুলি তিন বাহিনীর ব্যবহারের জন্য যথেষ্ট যোগ্য। সমস্যা থাকবে, ত্রুটি ধরা পড়বে, কিন্তু সেগুলি দেশের ভেতরেই ঠিক করার ক্ষমতা থাকাটাই সবচেয়ে বড় শক্তি। এখানে HAL শুধুমাত্র একটি বিক্রেতা নয়, বরং একটি অংশীদার। এই মানসিকতা থেকেই প্রকৃত আত্মনির্ভরতা তৈরি হয়। বিদেশি প্ল্যাটফর্মের ক্ষেত্রে আমরা গ্রাহক থাকি, কিন্তু নিজেদের প্ল্যাটফর্মে আমরা নির্মাতা, উন্নয়নকারী এবং সমস্যার সমাধানকারী।
আদর্শ পরিস্থিতিতে প্রতিরক্ষা মন্ত্রক এমন একটি পথ বেছে নিতে পারত, যেখানে HAL এবং বেসরকারি সংস্থাগুলি একসঙ্গে কাজ করত IMRH-এর মতো প্রকল্পে। HAL-এর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, ডিজাইন ও টেস্টিং সক্ষমতার সঙ্গে টাটা বা আদানির উৎপাদন দক্ষতা ও আর্থিক শক্তি যুক্ত হলে সত্যিকারের ‘বেস্ট অফ বোথ ওয়ার্ল্ডস’ তৈরি হতো। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অনেক সিনিয়র স্তরের সিদ্ধান্তে এমন ভাব ফুটে উঠছে যেন শুধু FAL বসালেই আত্মনির্ভরতা অর্জিত হয়ে যাবে।
এখানেই মূল সমস্যা। ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য IDDM বা Indigenous Design, Development and Manufacturing-এর কোনও বিকল্প নেই। সব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও HAL এই মুহূর্তে একমাত্র সংস্থা, যার কাছে সম্পূর্ণ দেশীয় হেলিকপ্টার ডিজাইন ও তৈরির ম্যান্ডেট এবং সক্ষমতা দুটোই আছে। এটাকে দুর্বল না করে বরং শক্তিশালী করা দরকার। বেসরকারি সংস্থাগুলিকে অবশ্যই সবরকম সমর্থন দেওয়া উচিত, যাতে তারা অসামরিক বাজারে কাজ করে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে, ধীরে ধীরে IPR তৈরি করতে পারে। কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় এমন প্ল্যাটফর্ম আমদানি করা উচিত নয়, যেগুলি আমরা নিজেরাই তৈরি করতে পারি যদি যথাযথ নীতি সহায়তা দেওয়া হয়।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা কেবল হেলিকপ্টার কেনা বা বানানোর নয়, প্রশ্নটা দৃষ্টিভঙ্গির। আমরা কি আত্মনির্ভরতাকে কেবল অ্যাসেম্বলি লাইন ও বড় বড় ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখব, নাকি ধীর, কঠিন কিন্তু টেকসই পথ বেছে নেব যেখানে ডিজাইন থেকে ডেলিভারি পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতেই থাকবে? অসামরিক ক্ষেত্রে FAL একটি দরকারি সেতু হতে পারে, কিন্তু সামরিক আত্মনির্ভরতার ভিত্তি হতে পারে না। সেই ভিত্তি গড়তে হলে HAL, বেসরকারি শিল্প এবং রাষ্ট্র—তিন পক্ষকেই অংশীদার হিসেবে ভাবতে হবে, গ্রাহক ও বিক্রেতা হিসেবে নয়।

