নতুন দিল্লি থেকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা বার্তা সামনে এসেছে, যা ভারতীয় নৌবাহিনীর ভবিষ্যৎ সক্ষমতা ও দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য এক যুগান্তকারী মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ভারত সরকার ও জার্মানির মধ্যে একটি আন্তঃসরকারি চুক্তি চূড়ান্ত হয়েছে, যার মাধ্যমে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পরবর্তী প্রজন্মের প্রচলিত সাবমেরিন নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নের পথ পুরোপুরি পরিষ্কার হল। এই চুক্তির অধীনে ভারতে ছয়টি অত্যাধুনিক সাবমেরিন তৈরি করা হবে এবং এর কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে গভীর প্রযুক্তি হস্তান্তর, দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা ও ভবিষ্যৎ রপ্তানির সম্ভাবনা।
প্রতিরক্ষা সূত্রের খবর অনুযায়ী, এই আন্তঃসরকারি চুক্তি বা IGA ইতিমধ্যেই চূড়ান্ত হয়েছে এবং মার্চ মাসের শেষের দিকে জার্মানির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভারতে এসে চূড়ান্ত স্বাক্ষর করতে পারেন। মূল নির্মাণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে ভারত সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রক ও Mazagaon Dock Shipbuilders Limited-এর মধ্যে, তবে এই IGA পুরো প্রকল্পটিকে একটি বিস্তৃত কৌশলগত ছাতার নিচে আনবে। এর মধ্যে থাকবে সংবেদনশীল প্রযুক্তি হস্তান্তরের নিশ্চয়তা, ভারতীয় কর্মীদের প্রশিক্ষণ, প্রশাসনিক ও রপ্তানি সংক্রান্ত ছাড়পত্র এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ সহায়তা।
এই প্রকল্পটি মূলত প্রজেক্ট-৭৫ আই (Project 75I) কর্মসূচির অংশ, যার লক্ষ্য ভারতীয় নৌবাহিনীর ক্রমবর্ধমান সাবমেরিন সংকট মোকাবিলা করা। বর্তমানে নৌবাহিনীর হাতে থাকা বহু কিলো-ক্লাস সাবমেরিন অবসর নেওয়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। গত দুই দশকে নৌবাহিনীর সাবমেরিন বহরে উল্লেখযোগ্য সংযোজন বলতে শুধুমাত্র ছয়টি কালভারি-ক্লাস সাবমেরিন, যেগুলিও MDL-এই নির্মিত। এই পরিস্থিতিতে নতুন প্রজন্মের সাবমেরিন যুক্ত করা নৌবাহিনীর জন্য সময়ের দাবি হয়ে উঠেছিল।
এই মেগা প্রকল্পে MDL-এর অংশীদার হচ্ছে জার্মানির নামকরা সাবমেরিন নির্মাতা Thyssenkrupp Marine Systems বা TKMS। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে একটি প্রযুক্তিগত তদারকি কমিটি MDL–TKMS জোটের প্রস্তাবকে অনুমোদন দেয়। এরপর প্রায় এক বছর ধরে খুঁটিনাটি প্রযুক্তিগত বিষয় ও খরচ সংক্রান্ত আলোচনা চলে, যেখানে MDL নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করে। অবশেষে সব বাধা কাটিয়ে এখন চুক্তি স্বাক্ষরের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে প্রকল্পটি।
যদিও চূড়ান্ত আর্থিক অঙ্ক এখনো প্রকাশ্যে আসেনি, তবে প্রতিরক্ষা মহলের ধারণা অনুযায়ী এর মোট মূল্য প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার হতে পারে। এই অর্থের একটি বড় অংশই যাবে প্রযুক্তি হস্তান্তর, বিশেষায়িত যন্ত্রপাতি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির পেছনে। ফলে শুধু সাবমেরিন তৈরি নয়, ভারতের অভ্যন্তরে একটি পূর্ণাঙ্গ সাবমেরিন নির্মাণ ইকোসিস্টেম গড়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে হাজার হাজার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, যা ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ উদ্যোগকে আরও শক্ত ভিত দেবে।
এই নতুন সাবমেরিনগুলির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হবে এয়ার ইন্ডিপেনডেন্ট প্রপালশন বা AIP ব্যবস্থা। এই প্রযুক্তির ফলে সাবমেরিনগুলি টানা প্রায় দুই সপ্তাহ পর্যন্ত পানির নিচে থাকতে পারবে, যা তাদের গোপনীয়তা ও যুদ্ধক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায়, বিশেষ করে ভারত মহাসাগর অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতার প্রেক্ষিতে, এই ক্ষমতা ভারতীয় নৌবাহিনীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রকল্পের বিশালতা ও প্রযুক্তিগত জটিলতার কারণে প্রথম সাবমেরিনটি চুক্তি স্বাক্ষরের প্রায় সাত বছর পর নৌবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে বলে অনুমান করা হচ্ছে। ছয়টি সাবমেরিনই ভারতে তৈরি হবে এবং এতে উচ্চমাত্রার প্রযুক্তি হস্তান্তর নিশ্চিত করা হবে। এর অর্থ, ভবিষ্যতে ভারত শুধু নিজস্ব প্রয়োজন মেটাতেই সক্ষম হবে না, বরং জার্মান অংশীদারের সঙ্গে যৌথভাবে তৃতীয় দেশে সাবমেরিন রপ্তানির সম্ভাবনাও তৈরি হবে।
এই দিকটি জার্মানির জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপের বাইরের নতুন বাজারে প্রবেশের জন্য TKMS ভারতের মতো একটি বড় ও দক্ষ জাহাজ নির্মাণ কেন্দ্রকে অংশীদার হিসেবে দেখতে চাইছে। জার্মান সংস্থার ধারণা, ভারতীয় শিপইয়ার্ডগুলি তুলনামূলক কম খরচে উচ্চমানের যুদ্ধজাহাজ তৈরি করতে সক্ষম, যা ভবিষ্যতে যৌথ রপ্তানিকে প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে।
ভারতীয় নৌবাহিনী এই চুক্তিটি চলতি আর্থিক বছরের মধ্যেই স্বাক্ষর করতে আগ্রহী। কারণ, একদিকে সাবমেরিনের ঘাটতি দ্রুত বাড়ছে, অন্যদিকে চলতি বছরের বাজেটে এই প্রকল্পের জন্য আর্থিক সংস্থানও রাখা হয়েছে। চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে প্রথম কিস্তির অর্থ MDL-কে দেওয়া হবে এবং প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে বাস্তবায়নের পথে এগোবে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এই ভারত–জার্মানি সাবমেরিন চুক্তি শুধু একটি অস্ত্র ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নয়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত বিনিয়োগ, যা ভারতীয় নৌবাহিনীর আন্ডারওয়াটার যুদ্ধক্ষমতাকে নতুন স্তরে নিয়ে যাবে এবং একই সঙ্গে দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পকে বৈশ্বিক মানচিত্রে আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করবে। প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ রপ্তানির সম্ভাবনা মিলিয়ে এই প্রকল্পকে ভারতের সামুদ্রিক শক্তির ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
Source -The Economic Time
