মধ্যপ্রাচ্যে আবারও যুদ্ধের মেঘ ঘনিয়ে আসছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তে থাকা সামরিক উপস্থিতি, অন্যদিকে ইরানের পাল্টা হুঁশিয়ারি—এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে গোটা অঞ্চল আজ চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে। ঠিক এই সময়েই একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক উদ্যোগ সামনে এসেছে। মিশর, তুরস্ক ও কাতার যৌথভাবে চেষ্টা চালাচ্ছে যাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি বা উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এই বৈঠকটি তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং তা হতে পারে খুব শিগগিরই।
এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য একটাই—যুদ্ধ এড়ানো। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের যে ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা, সেখানে একটি সীমিত হামলাও মুহূর্তের মধ্যে বড় আকারের আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে পারস্য উপসাগর, হরমুজ প্রণালী এবং আশপাশের সমুদ্রপথগুলো বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে সেখানে অস্থিরতা মানেই গোটা বিশ্বের ওপর প্রভাব।
বর্তমান পরিস্থিতির সূচনা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সামরিক পদক্ষেপ থেকে। ওয়াশিংটন মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত নৌ ও বিমান শক্তি মোতায়েন করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এই পদক্ষেপ পুরোপুরি প্রতিরোধমূলক এবং এর উদ্দেশ্য ইরানকে কোনো উসকানিমূলক কাজ থেকে বিরত রাখা। তবে ইরান একে ভিন্নভাবে দেখছে। তেহরানের মতে, এই সামরিক জমায়েত আসলে আক্রমণের প্রস্তুতি এবং যেকোনো হামলা হলে তার জবাব শুধু সীমিত থাকবে না।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের ওপর হামলা চালায়, তাহলে তার প্রতিক্রিয়া হবে আঞ্চলিক যুদ্ধ। এই বক্তব্যকে শুধু কথার কথা বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ একই সময়ে ইরানি সেনাবাহিনী হরমুজ প্রণালীর কাছে বড় আকারের লাইভ-ফায়ার মহড়া চালিয়েছে। হরমুজ প্রণালী এমন একটি সমুদ্রপথ, যেখান দিয়ে বিশ্বের মোট তেলের একটি বিশাল অংশ পরিবাহিত হয়। এই পথে সামান্য অস্থিরতাও আন্তর্জাতিক তেল বাজারে তীব্র ধাক্কা দিতে পারে।
এই উত্তপ্ত পরিবেশে তুরস্ক, মিশর ও কাতার এগিয়ে এসেছে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে। এই তিন দেশ আগেও সংকটকালে কূটনৈতিক ভূমিকা রেখেছে। সাম্প্রতিক গাজা যুদ্ধবিরতির সময়েও তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করেছিল। সেই অভিজ্ঞতাকেই কাজে লাগিয়ে এবার তারা ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করছে।
সূত্রের দাবি, আঙ্কারায় সম্ভাব্য বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে অংশ নিতে পারেন হোয়াইট হাউসের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। ইরানের দিক থেকেও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের উপস্থিতির সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু ঘোষণা করা হয়নি, তবে বিভিন্ন কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে প্রস্তুতি চলছে বলে জানা গেছে।
তুরস্কের ভূমিকা এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান প্রকাশ্যেই বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংলাপের জন্য তুরস্ক প্রস্তুত। ভৌগোলিক অবস্থান, ন্যাটো সদস্যপদ এবং একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক—এই তিনটি বিষয় তুরস্ককে একটি অনন্য অবস্থানে রেখেছে। আঙ্কারা বুঝতে পারছে, এই সংঘাত বাড়লে তার নিজের নিরাপত্তা ও অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
মিশরও নীরবে কিন্তু সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাদা আলাদা বৈঠক করেছেন। কায়রোর বার্তা পরিষ্কার—উত্তেজনা কমাতে হবে এবং সামরিক সংঘাতের পথ এড়াতে হবে। মিশরের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ইরানের প্রেসিডেন্টের ফোনালাপও এই প্রচেষ্টার অংশ। সেখানে ইরান জানিয়েছে, তারা আঞ্চলিক উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে সমন্বয়ের পক্ষে।
কাতারের ভূমিকাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। দেশটি দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি নীরব যোগাযোগ সেতু হিসেবে কাজ করে আসছে। সাম্প্রতিক সময়ে কাতারের প্রধানমন্ত্রী তেহরানে গিয়ে ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সেই বৈঠকে মূল আলোচ্য ছিল কীভাবে পরিস্থিতি শান্ত রাখা যায় এবং সংঘাত এড়ানো যায়।
এই কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি তুলনামূলকভাবে নরম সুরে কথা বলেছেন। ইরানের সর্বোচ্চ নেতার হুঁশিয়ারির পর ট্রাম্প বলেছেন, তিনি ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তির আশায় আছেন। যদিও ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিতে কঠোরতা বরাবরই দেখা গেছে, তবু এই বক্তব্য অনেকের চোখে উত্তেজনা কমানোর ইঙ্গিত।
তবে ইরানের দিক থেকে বিষয়টি এত সহজ নয়। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্টভাবে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর তাদের আস্থা নষ্ট হয়ে গেছে। অতীতে একাধিক চুক্তি ভেঙে যাওয়ার অভিজ্ঞতা ইরানকে সন্দিহান করে তুলেছে। তবুও তিনি এটাও স্বীকার করেছেন যে মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদান কিছু ক্ষেত্রে ফলপ্রসূ হয়েছে। ইরানের অবস্থান হলো, আলোচনার ধরন নয়, আলোচনার বিষয়বস্তুই আসল।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি অনেকটাই অতীতের কিছু সংকটের মতো, যেখানে বহিরাগত শক্তির হস্তক্ষেপ একটি দেশ বা অঞ্চলকে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতায় ঠেলে দিয়েছে। ইরাক, লিবিয়া বা সিরিয়ার উদাহরণ এখনও টাটকা। তাই মধ্যপ্রাচ্যের বহু দেশ চাইছে না আরেকটি নতুন যুদ্ধ শুরু হোক।
যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি সংঘাত শুরু হয়, তাহলে তার প্রভাব শুধু এই দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। ইসরায়েল, উপসাগরীয় দেশগুলো, লেবানন, ইয়েমেন—সবাই কোনো না কোনোভাবে জড়িয়ে পড়তে পারে। সেই সঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং সামুদ্রিক পরিবহন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এই কারণেই আঙ্কারায় সম্ভাব্য বৈঠককে অনেকেই একটি শেষ সুযোগ হিসেবে দেখছেন। যদিও বৈঠক হলেই যে সব সমস্যার সমাধান হবে, তা নয়। কিন্তু অন্তত সরাসরি কথা বলার একটি পথ খুলবে। যুদ্ধের আগে সংলাপ—এই নীতিই এখন মধ্যপ্রাচ্যের বহু দেশের আশা।
সব মিলিয়ে বলা যায়, তুরস্ক, মিশর ও কাতারের এই যৌথ উদ্যোগ শুধু একটি বৈঠকের আয়োজন নয়, বরং একটি বড় আঞ্চলিক সংকট ঠেকানোর চেষ্টা। ওয়াশিংটন ও তেহরান শেষ পর্যন্ত কতটা নমনীয় হয়, সেটাই নির্ধারণ করবে আগামী দিনগুলো শান্তির দিকে যাবে, না কি আরও অস্থিরতার দিকে। মধ্যপ্রাচ্য ও গোটা বিশ্ব এখন সেই দিকেই তাকিয়ে আছে।
সোর্স – Shramonlin
