শ্রীলঙ্কা, ভারত মহাসাগরের এই ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র, সাম্প্রতিককালে আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে উঠেছে। ২০২৬ সালের মার্চ মাসে যুক্তরাষ্ট্রের একটি আক্রমণাত্মক সাবমেরিন ইরানের একটি অস্ত্রহীন ফ্রিগেটকে টর্পেডো করে ডুবিয়ে দিলে, শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনী শুধুমাত্র উদ্ধার অভিযান চালায়নি, বরং দ্বিতীয় ইরানী যুদ্ধজাহাজ থেকে ২০৮ জন ক্রু সদস্যকে নিরাপদে উদ্ধার করে আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন এবং মানবিক দায়িত্বকে প্রাধান্য দিয়েছে। এই ঘটনা, যা ভারতের মিলান-২০২৬ বহুপাক্ষিক নৌ-অভ্যাস থেকে ফিরছিল ইরানী নৌবহরের সাথে যুক্ত, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের সাথে সম্পর্কের ঝুঁকি নিয়েও শ্রীলঙ্কাকে নিরপেক্ষতার পথে অটল রেখেছে। প্রেসিডেন্ট অনুরা কুমার দিসানায়েকের টেলিভিশিতে প্রচারিত ভাষণে বলা হয়েছে, “কোনো মানুষ এমন যুদ্ধে মরতে পারে না। প্রত্যেক জীবন সমান মূল্যবান… আমরা পক্ষ নিচ্ছি না, কিন্তু নিরপেক্ষতা বজায় রেখে জীবন রক্ষার পদক্ষেপ নিচ্ছি।” এই সিদ্ধান্ত শুধুমাত্র একটি মানবিক কাজ নয়, বরং গ্লোবাল অর্ডারে ছোট দেশের স্বাধীনতার প্রতীক।
শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক ইতিহাস নিরপেক্ষতা এবং মানবিকতার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে শ্রীলঙ্কা নন-অ্যালাইনড মুভমেন্টের (NAM) অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। ১৯৫৬ সালের বান্দুঙ্গ কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রী সোলমন বন্ডারনায়েকের নেতৃত্বে এই আন্দোলন গড়ে ওঠে, যা ঠান্ডা যুদ্ধের মধ্যে ছোট দেশগুলোকে মহাশক্তির মধ্যে নিরপেক্ষ থাকার পথ দেখায়। কিন্তু ১৯৮৩-২০০৯ সালের নাগরিক যুদ্ধের সময় ভারত এবং অন্যান্য দেশের হস্তক্ষেপ এই নিরপেক্ষতাকে চ্যালেঞ্জ করে। ২০২২ সালের অর্থনৈতিক সংকটের পর অনুরা কুমার দিসানায়েকের নেতৃত্বাধীন জাতিক জন বলবেগয়া পার্টি (JVP) ক্ষমতায় আসার সাথে সাথে ফরেন পলিসি নতুন করে গড়ে তোলা হয়। দিসানায়েক সরকার চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে, বিশেষ করে হাম্বানটোটা বন্দর প্রকল্পে চীনের বিনিয়োগ সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক মজবুত করেছে। এই পটভূমিতে ২০২৬ সালের ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত শ্রীলঙ্কার নিরপেক্ষতাকে পরীক্ষা করে। গবেষণায় দেখা যায়, ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলো মহাসাগরীয় অবস্থানের কারণে ভূ-রাজনৈতিক চাপের শিকার হয়, কিন্তু শ্রীলঙ্কার মতো দেশ আইনি ফ্রেমওয়ার্ক ব্যবহার করে স্বাধীনতা রক্ষা করে।
মিলান-২০২৬ অভ্যাস এই ঘটনার পটভূমি। ভারত নৌবাহিনীর ফ্ল্যাগশিপ এই বহুপাক্ষিক অভ্যাস ১৯৯৫ সাল থেকে অনুষ্ঠিত হয়, যা ভারত মহাসাগরের দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ায়। ২০২৬ সালের সংস্করণে ৭৪টি দেশ, ৪২টি জাহাজ, ২৯টি বিমান অংশগ্রহণ করে। এটি দু’ভাগে বিভক্ত: হারবার ফেজে পরিকল্পনা এবং সি ফেজে বাস্তব অভ্যাস। ইরানের দক্ষিণ নৌবহর এই অভ্যাসে অংশ নেয়, যার মধ্যে ছিল IRIS Dena ফ্রিগেট এবং IRINS Bushehr লজিস্টিক্স জাহাজ। Dena, মুদজ-ক্লাসের একটি আধুনিক ফ্রিগেট, যার সজ্জা রয়েছে কাদির অ্যান্টি-শিপ মিসাইল, সায়্যাদ এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম এবং টর্পেডো। এটি ইরানের নৌশক্তির গর্ব, যা ২০১৬ সালে কমিশন হয়েছে। Bushehr, অন্যদিকে, একটি সাপ্লাই এবং রিপ্লেনিশমেন্ট শিপ, যা নৌবহরের লজিস্টিক সাপোর্ট দেয়। অভ্যাস ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে শেষ হয়, এবং ইরানী বহর ভারত মহাসাগর পার হয়ে ফিরছিল। এই সময় ইরান-ইসরায়েল সংঘাত তীব্র হয়, যাতে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের পক্ষে যোগ দেয়। গবেষণামূলকভাবে, এমন অভ্যাসগুলো শান্তি প্রচার করে, কিন্তু সংঘাতের সময় এগুলোকে টার্গেট করে।
ঘটনার বিবরণ ভয়াবহ। ২০২৬ সালের ৪ মার্চ, শ্রীলঙ্কার দক্ষিণ উপকূলে IRIS Dena-কে যুক্তরাষ্ট্রের একটি ফাস্ট অ্যাটাক সাবমেরিন (সম্ভবত ভার্জিনিয়া-ক্লাস) Mk 48 টর্পেডো দিয়ে আক্রমণ করে। এই ফ্রিগেট অস্ত্রহীন ছিল এবং শুধুমাত্র অভ্যাস থেকে ফিরছিল। আক্রমণে কমপক্ষে ৮০ জন নিহত এবং ১০১ জন লাপাত্তা হয়। শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনী উদ্ধার অভিযান চালায়, কিন্তু শরীরগুলো এখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি। পেন্টাগনের ব্রিফিংয়ে ডিফেন্স সেক্রেটারি পিট হেগসেথ বলেন, এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম এমন আক্রমণ। ইরান এটিকে যুদ্ধাপরাধ বলে অভিযোগ করে। এই ঘটনার পর IRINS Bushehr, যা একই বহরের অংশ, শ্রীলঙ্কার জলসীমায় প্রবেশ করে সাহায্য চায়। এর ক্রু—৫৩ অফিসার, ৮৪ ক্যাডেট, ৪৮ সিনিয়র সেইলর এবং ২৩ সেইলর—নিরাপত্তার জন্য উদ্বিগ্ন ছিল, কারণ Dena-এর ভাগ্য তাদের শিক্ষা দিয়েছে। শ্রীলঙ্কা জাহাজটিকে ইন্টার্ন করে (অস্থায়ী আটক), ক্রুকে কলম্বোতে নিয়ে আসে। এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইনের (UNCLOS ১৯৮২) ধারা ৯৮ অনুসারে, যা রাষ্ট্রকে বিপদে পড়া জাহাজের সাহায্য করতে বাধ্য করে।
প্রেসিডেন্ট দিসানায়েকের ভাষণ এই সিদ্ধান্তের নৈতিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত করে। ২০২৬ সালের ৫ মার্চ প্রেসিডেন্সিয়াল সেক্রেটারিয়েটে একটি স্পেশাল মিডিয়া ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, “আমরা নিরপেক্ষ, কিন্তু মানবিকও।” এই বক্তব্যে তিনি জাতীয় স্বার্থ এবং মানবতার মধ্যে ভারসাম্যের কথা বলেন। তাঁর সরকারের নীতি অনুসারে, শ্রীলঙ্কা কোনো পক্ষের সাথে যোগ দিচ্ছে না, কিন্তু জেনেভা কনভেনশনের (১৯৪৯) ধারা ৩ অনুসারে যুদ্ধবন্দী এবং বেসামরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করছে। এই ভাষণ সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়, এবং আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়। গবেষণায় দেখা যায়, এমন নেতৃত্ব ছোট দেশের ডিপ্লোম্যাসিক ক্রেডিবিলিটি বাড়ায়।
আইনি দিক থেকে, যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণ UNCLOS-এর লঙ্ঘন। ধারা ৮৮ অনুসারে, উচ্চ সমুদ্র শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের জন্য, এবং ধারা ৯৯ যুদ্ধবন্দীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করে। ইরান জাতিসংঘে অভিযোগ করে, যুক্তরাষ্ট্র এটিকে ‘প্রিভেন্টিভ স্ট্রাইক’ বলে দাবি করে। শ্রীলঙ্কার পদক্ষেপ, তবে, আইনসম্মত—তারা জাহাজ ইন্টার্ন করে কিন্তু ক্রুকে মুক্তি দিয়েছে। এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের (ICRC গাইডলাইন) অনুসরণ করে। গবেষণামূলকভাবে, এই ঘটনা দেখায় কীভাবে সমুদ্র আইন মহাশক্তির অপব্যবহার রোধ করে।
এই ঘটনার প্রভাব বিস্তৃত। আঞ্চলিকভাবে, ভারত মহাসাগরে উত্তেজনা বাড়ে—ইউরোপীয় দেশগুলো নৌ এবং বিমান মোতায়েন করে। শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি, যা পর্যটন এবং বাণিজ্য-নির্ভর, ঝুঁকিতে পড়ে, কিন্তু এই সাহসিকতা আন্তর্জাতিক সাহায্য আকর্ষণ করে। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কে চাপ পড়লেও, দিসানায়েকের নিরপেক্ষতা ভারত এবং চীনের সাথে সম্পর্ক মজবুত করে। গ্লোবালি, এটি ছোট দেশের জন্য মডেল—কীভাবে আইন এবং মানবতা চাপ সহ্য করে। ভবিষ্যতে, এই ঘটনা জাতিসংঘের সমুদ্র আইন সংস্কারে প্রভাব ফেলতে পারে
