Monday, April 20, 2026
HomeWorld Geopolitics & Military Affairsহরমুজ অবরোধ এবং নতুন তেলের খেলা: আমেরিকার হেজিমনি বজায় রাখার কৌশল।

হরমুজ অবরোধ এবং নতুন তেলের খেলা: আমেরিকার হেজিমনি বজায় রাখার কৌশল।

সোমবার থেকে স্ট্রেইট অব হরমুজে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ নৌ-অবরোধ কার্যকর হওয়ার পর বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির মানচিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ শুধু ইরানকে চাপে ফেলছে না, বরং আমেরিকাকে নতুন এক তেল সরবরাহ ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র দুটি জিনিস প্রমাণ করতে চাইছে — প্রথমত, আমেরিকা, কানাডা, ব্রাজিল ও ভেনেজুয়েলাকে নিয়ে একটি নতুন নিরাপদ তেল সরবরাহ চেইন গড়ে তুলছে; দ্বিতীয়ত, বিশ্বের দেশগুলোকে তার দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে ‘সুইং প্রডিউসার’ হিসেবে নিজের অবস্থান অটুট রাখতে চাইছে। এই কৌশলের লক্ষ্য মূলত চীন ও এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতিগুলোকে দুর্বল করা, যাতে বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থা (মাল্টিপোলারিটি) গড়ে ওঠার আগেই তা থামানো যায়।

হরমুজ বন্ধ হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের তেল চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। চীন তার মোট তেল আমদানির বড় অংশ সমুদ্রপথে আনে। হরমুজ অবরোধ তার শিল্প ও অর্থনীতিতে সরাসরি আঘাত হানছে। একই সময়ে ভেনেজুয়েলার তেল ছোট ও রাজনৈতিকভাবে নিরাপদ পথে আমেরিকার গাল্ফ কোস্টে যাচ্ছে। কানাডা ও ব্রাজিলের সঙ্গে মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখন একটি শক্তিশালী পশ্চিমা তেল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে। এতে আমেরিকা বিশ্বের তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে ‘সুইং প্রডিউসার’ হিসেবে আবির্ভূত হতে চাইছে — অর্থাৎ চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন বাড়িয়ে বা কমিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করবে।

সৌদি আরবকে পাশে রাখা এই কৌশলের অন্যতম স্তম্ভ। যুক্তরাষ্ট্র সৌদির সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত রেখে ওপেকের প্রভাব কমিয়ে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করছে। সৌদি উৎপাদন বাড়িয়ে বাজার স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করছে, যা আমেরিকার স্বার্থেই কাজ করছে। ফলে চীনের মতো দেশগুলোকে আমেরিকার দিকে তাকাতে হচ্ছে। এটি ট্রাম্প ডকট্রিনের বাস্তব রূপ — প্রতিযোগীদের দুর্বলতাকে নিজের সুবিধায় পরিণত করা।

চীনের জন্য এই সংকট আরও গভীর। মালাক্কা প্রণালীসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য প্রণালী এখন তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। হরমুজ বন্ধ থাকায় চীনকে বিকল্প পথ খুঁজতে হচ্ছে, যার খরচ অনেক বেশি। এর ফলে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ চাপে পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য স্পষ্ট — এশিয়ার অর্থনীতিগুলোকে দুর্বল করে বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থা গড়ে ওঠার পথ বন্ধ করা। নৌচলাচল, জ্বালানি এবং বাণিজ্যিক রুট নিয়ন্ত্রণ করে আমেরিকা চীনের উত্থানকে থামাতে চাইছে।

ডি-ডলারাইজেশন নিয়ে আলোচনা চলছে। ডলারে লেনদেনের শতাংশ কমছে সত্যি, কিন্তু এখনও কোনো বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প নেই। দেশগুলো নিজেদের মুদ্রায় লেনদেন বাড়াচ্ছে, কিন্তু তা পুরোপুরি বিকল্প নয়। এতে আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা আরোপের ক্ষমতা কিছুটা কমছে, তবে এখনও ডলারের আধিপত্য অটুট। যুক্তরাষ্ট্র এই ‘উইন্ডো’কে কাজে লাগিয়ে বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে। হরমুজ অবরোধ তারই একটি অংশ।

ভারতের প্রেক্ষাপট এখানে গুরুত্বপূর্ণ। দেশটি বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক। হরমুজ অবরোধে তেল ও সারের দাম বেড়েছে। কিন্তু ভারত সুযোগও নিচ্ছে। আরব দেশগুলোতে খাদ্য রপ্তানিতে ব্রাজিলকে টপকে শীর্ষে উঠেছে। মার্চ মাসে বাণিজ্য ঘাটতি কমেছে ২০.৬৭ বিলিয়ন ডলারে। আমেরিকায় রপ্তানি ১৭.৪ শতাংশ বেড়েছে। সৌদি, ইরাক ও রাশিয়া থেকে তেল আমদানি বাড়িয়ে সংকট সামলাচ্ছে। নেপালের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখছে। বালেন শাহের সফরে নতুন প্রকল্প ও এমওইউ আসছে।

নৌবাহিনীতে ভারতের অগ্রগতিও লক্ষণীয়। আইএনএস আরিধামনের মতো পারমাণবিক সাবমেরিন সাফল্য এসেছে, কিন্তু প্রচলিত সাবমেরিন নির্মাণে স্থবিরতা রয়েছে। রাশিয়ার সহযোগিতা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ভারতকে নৌশক্তি আরও বাড়াতে হবে যাতে মহাসাগরীয় অঞ্চলে তার প্রভাব অটুট থাকে।

ইরানের অবস্থা সঙ্কটাপন্ন। তেল রপ্তানি বন্ধ, অর্থনীতি ধুঁকছে। আইআরজিসির অ্যাসিমেট্রিক হামলা চলছে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকা কঠিন। ইসলামাবাদে আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর তাদের হাতে অপশন কম। উপসাগরীয় দেশগুলো আমেরিকার পদক্ষেপে স্বস্তি পাচ্ছে।

এই নতুন গ্রেট গেমে আমেরিকা বিশ্বকে পুড়িয়ে দিতেও প্রস্তুত। হেজিমনি বজায় রাখার জন্য যেকোনো মূল্য দিতে রাজি। চীন, রাশিয়া ও অন্যান্য দেশ মাল্টিপোলারিটির জন্য লড়ছে। কিন্তু আমেরিকা এখনও শক্তিশালী। ডলারের আধিপত্য কমলেও বিকল্প না থাকায় তার ক্ষমতা অটুট।

ভারতের জন্য এই পরিস্থিতি চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ দুটোই। জ্বালানি বৈচিত্র্যকরণ, দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে হবে। খাদ্য রপ্তানির সাফল্যকে আরও প্রসারিত করা দরকার। প্রতিরক্ষায় স্বনির্ভরতা বাড়াতে হবে। নৌবাহিনীর আধুনিকীকরণ জরুরি।

বিশ্ব এখন একটি সন্ধিক্ষণে। যুক্তরাষ্ট্র তার জানালা ব্যবহার করে হেজিমনি দীর্ঘায়িত করতে চাইছে। চীন ও এশিয়াকে দুর্বল করার খেলা চলছে। কিন্তু ইতিহাস বলে, কোনো শক্তি চিরকাল টেকে না। বহুমুখী বিশ্ব গড়ে উঠলে নতুন সমীকরণ তৈরি হবে।

ভারতকে এই খেলায় স্মার্ট কূটনীতি দেখাতে হবে। আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি, রাশিয়ার সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং আরব দেশগুলোর সঙ্গে খাদ্য কূটনীতি — সবকিছু সামঞ্জস্য রেখে এগোতে হবে। হরমুজের অবরোধ শুধু একটি জলপথের ঘটনা নয়, এটি ২১শ শতাব্দীর শক্তির লড়াইয়ের প্রতীক।

যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব পোড়াতে চাইলেও ভারতের মতো দেশগুলোকে শান্তি ও স্থিতিশীলতার পথ খুঁজতে হবে। এই সংকট থেকে উঠে আসার জন্য স্বনির্ভরতাই একমাত্র পথ। ভারত যদি তার কৃষি, প্রতিরক্ষা ও কূটনীতিতে সঠিক পদক্ষেপ নেয়, তাহলে এই নতুন গ্রেট গেমে সে শুধু টিকবে না, এগিয়েও যাবে।

 

লেখক – দীপংকর সাহা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

Recent Comments